রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩২ অপরাহ্ন

ট্যুরিস্ট হয়ে এসে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ছেন চীনা নাগরিকরা

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

ট্যুরিস্ট হিসেবে বাংলাদেশে এসে অপরাধের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন চীনা নাগরিকদের কেউ কেউ। মাদক, নারী পাচার ও অনলাইন প্রতারণার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা গড়ে তুলেছেন এসব নেটওয়ার্ক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত চীনা নাগরিকদের গ্রেফতারের পর এমন তথ্য উঠে এসেছে।

কিটামিনের ল্যাব, ডার্ক ওয়েবে মাদকের অর্ডার

গত ৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়। পরে পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।

উদ্ধারকৃত পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। একই দিন রাতে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি আবাসিক ভবনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিক লি বীন, ইয়াং চুনহিং ও ইয়ো ঝিকে আটক করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ওই ঘটনার সূত্র ধরে পরিচালিত অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬ হাজার ৩০০ কেজি কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য সালফিউরিক এসিড, ইথানল ও অ্যালকোহল; বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত থেকে প্রতীয়মান হয়, চক্রটি সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।

অধিদফতরের উপপরিচালক মেহেদি হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছে, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করতো। পরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করতো।

তিনি জানান, চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করত এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করতো তারা।

অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করতো। তারা মূলত টিআরওএন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করত এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করত। পরে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করত, যা তাদের কার্যক্রম গোপন রাখতে সহায়ক ছিল।

মেহেদি হাসান বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামিদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করত এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করত। এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপিত থাকতে পারে। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব সহকারে তদন্তাধীন রয়েছে।

মাদকনিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

অনলাইন প্রতারণার নেটওয়ার্ক

গত ২ আগস্ট রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভিওআইপি, জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইস এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত একটি প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতাররা হলেন ঝর্না চাকমা জিয়ানা (২৭), লিউ হুই জাং (৪৬), ওয়ে ইউজি (৩০) ও শে ই রান (৪২)।

ডিবি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগের একটি দল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ছয়তলা ভবনে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে ১৪টি ল্যাপটপ, ১৬টি স্মার্টফোন, বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সিমকার্ড, ২০টি জিএসএম গেটওয়ে ডিভাইস, ২৬ বোতল বিদেশি মদ এবং নগদ ২ লাখ ৯ হাজার ৭০০ টাকা জব্দ করা হয়।

ডিবি সূত্র জানায়, ঝর্না চাকমা জিয়ানা পুরো ভবনটি ভাড়া নিয়ে এর চতুর্থ ও পঞ্চম তলা চীনা নাগরিকদের কাছে সাবলেট দেন। সেখানে অবস্থান করে তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা ও অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।

চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোনে চাকরি, বিশেষ অফার কিংবা অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বার্তা পাঠাতো। ওই বার্তায় থাকা লিংকে প্রবেশ করলেই ভুক্তভোগীরা প্রতারণার ফাঁদে পড়তেন।

ডিবি জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে চক্রটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করত। একটি মোবাইল ডিভাইসের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে একাধিক সিম স্লট যুক্ত করে একই সঙ্গে ১২টি সিম পরিচালনা করা হতো। ফলে প্রতারণার অভিযোগ এলেও সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের আইএমইআই নম্বর দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তো।

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চীনা নাগরিকদের নানা অপরাধের বিষয় উঠে আসছে। ইতোমধ্যে অনলাইনে প্রতারণার অভিযোগে বেশ কিছু নাগরিককে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশীয় কিছু ব্যক্তির যোগসাজশে তারা অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। তদন্তে আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

বিয়ের ফাঁদে নারী পাচারের চেষ্টা

২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বিয়ে ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশি দুই নারীকে চীনে পাচারের চেষ্টার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের দুই নাগরিককে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন, মে পেনগুই ও তিয়ান জেংওয়েন। দুই বাংলাদেশি রানী আক্তার ও মালিনা মারাককে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে বিয়ে করে উন্নত জীবনযাপনের জন্য চীনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা।

ওই দুই নারী বিমানবন্দরে আসার পর বুঝতে পারেন, তাদের অসৎ উদ্দেশ্যে চীনে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা দুই চীনা নাগরিকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তারা যেতে অস্বীকৃতি জানালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসেন এবং দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়।

একই বছরের ৯ ডিসেম্বর একই কায়দায় এক নারীকে পাচারের সময় দুই চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন, ফ্যান গোউয়ে (২৭) ও ইয়াং জিকু (২৫)। চাঁদপুর জেলার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রথমে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের নজরে আসে। পরে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৮ মে একই অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিক গ্রেফতার হন। তারা হলেন হু জানজুন (৩০) ও জিয়াং লিজি (৫৪)।

চীনা নাগরিকদের গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগী তরুণীদের উদ্ধৃতি দিয়ে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মানবপাচারকারী চীনা নাগরিকরা দেশে এসে নিকুঞ্জ, উত্তরা কিংবা বসুন্ধরা এলাকায় আস্তানা গড়েন। এরপর দেশীয় দালালদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধুত্ব করেন। তিন মাস কিংবা ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশে আসার মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা ওই তরুণীর গ্রামের বাড়িতে যান।

এরপর বিশ্বাস অর্জন করে নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মেয়েদের চীনে নিয়ে যান বা নেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো তাদের নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেওয়া।

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনিতা রানী সূত্রধর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশ কিছু দেশের মানবপাচারকারী চক্র স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় নারী পাচারের চেষ্টায় লিপ্ত। তারা মূলত গ্রামের সহজ-সরল নারীদের টার্গেট করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করার চেষ্টা করে। তথ্য পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করি।’

অন-অ্যারাইভাল ভিসায় এসে অভিজাত এলাকায় ‘আস্তানা’

রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান, উত্তরা, বসুন্ধরা এবং নিকুঞ্জ এলাকাতেই মূলত তাদের আস্তানা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিরা এসব এলাকায় আস্তানা গেড়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। এছাড়া রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামে আস্তানা গেড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্যও পাওয়া যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত ট্যুরিস্ট হিসেবে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় যারা আসছেন, তারাই এসব অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা মূলত ট্যুরিস্ট হিসেবে এসেছিলেন। তাদের ভিসার মেয়াদ ছিল দুই থেকে তিন মাস।

একই তথ্য পাওয়া যায় ডিবির কাছ থেকেও। ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, তারা স্বল্প সময়ের জন্য দেশে এসে এ ধরনের অপরাধ করে আবার চলে যান। পরে আরেকটি গ্রুপ আসে। এভাবেই তারা কার্যক্রম চালাত।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, চীনের নাগরিকরা অন-অ্যারাইভাল ভিসা পান। তারা অন-অ্যারাইভাল ডেস্ক থেকে দুই থেকে তিন মাসের ভিসা পান। সেক্ষেত্রে তাদের একটি খরচ বহন করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘ইমিগ্রেশনের আসলে এখানে করার কিছু নেই। কে অপরাধী আর কে অপরাধী না, সেটা তো আমরা বুঝতে পারি না। যদি কেউ অপরাধে জড়ায়, তবে আমাদের অন্যান্য উইং আছে, তারা সেটি দেখবে।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিছুদিন আগেও দেখা যেত আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকরা নানা অপরাধে যুক্ত। তারা প্রায়ই গ্রেফতারও হতেন। কিন্তু বর্তমানে চীনের মতো একটি দেশের নাগরিকরা যে অপরাধে যুক্ত, তা সত্যিই অবাক করার মতো।

তিনি বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, তাতে করে তাদের আসতে কঠোরতাও আমরা করতে পারছি না। পাশাপাশি দেশে এসে তারা যে অপরাধ করছে, তাতে করে আমরা বিব্রতও হচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চের উচিত হবে এগুলো তীক্ষ্ণ নজরদারির মধ্যে রাখা।’


এই বিভাগের আরো খবর