সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১০ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীতে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশায় বাড়ছে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

২০০৯ সালের মাঝামঝি সময়ে রাজশাহীতে আসে ইজিবাইক। তখনো সড়কে চলতো টেম্পু। পর্যায়াক্রমে ইজিবাইকের দাপটে বিলুপ্ত হয় টেম্পু। এরপরে একচেটিয়ে রাজত্ব কায়েক করে ইজিবাইক। তার কিছু দিনের মধ্যে সড়কে আসে দুই আসনের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ফলে যাত্রীদের আগ্রহ ও চালকের সুবিধায় উঠে যায় প্যাডেলের রিকশা। 

প্রথম দিকে নতুন ইজিবাইকের দাম ছিল ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে। আর অটোরিকশার দাম ছিল ৫০ হাজারের ঘরে। কিন্তু ১৫ বছরে সেই ইজিবাইকের দাম ২ লাখ ৬০ থেকে ৮০ হাজারে ঠেকেছে। অটোরিকশার দাম ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে এসব গাড়িগুলো সড়কে নামানো হচ্ছে। অনুমোদনহীন অটো লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকের হাতে থাকায় ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব গাড়ি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

রাজশাহীতে দুই ধরনের ব্যাটারিতে চলে গাড়িগুলো। একটি পাউডার ব্যাটারি। অপরটি লিথিয়াম ব্যাটারি বা পানি ব্যাটারি। পাউডার ব্যাটারি চেয়ে লিথিয়ামের দাম বেশি। চলেও বেশি। তবে সর্বসাকুল্যে দেড় থেকে দুই বছরের বেশি চলে চলে না এসব ব্যাটারি। নষ্ট হওয়ার পরে ব্যাটারিগুলো আবার অর্ধেক দামে বিক্রি করেন চালকেরা। তাতে লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় অদলবদল করা। অনেকেই ব্যাটারি বিক্রির টাকার সঙ্গে যোগ দিয়ে নতুন ব্যাটারি তুলছেন গাড়িতে।

রাজশাহী জেলায় ইজিবাইক ও অটোরিকশা কত চলাচল করে তার সঠিক পরিসংখান নেই। তবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) ১০ হাজার ইজিবাইক এবং ৬ হাজার অটোরিকশা নগরে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এই অটোগুলো রাসিক লাল ও সবুজ রঙ করে দিয়েছে। এই দুই রঙের অটোগুলো দিনে দুই সিফটে চলাচল করে। তবে রাসিকের দেওয়া পরিসংখানে একমত নয় খোদ চালকরাই।

অপরদিকে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় আরও ৫০ হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করে। তবে বিপুল সংখ্যক এই গাড়ির অনুমোদন না থাকায় সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। গড়ে প্রতিটি উপজেলায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করে। উপজেলা পর্যায়ের এই গাড়ির চালকরা জীবিকার তাগিদে শহরে চলে আসে। তাই তুলনামূলক উপজেলার সড়কগুলোতে এই গাড়ি কম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ৯৬ বর্গকিলোমিটারের নগরীতে প্রায় ৬০ হাজার ইজিবাইক ও অটোরিকশা চলাচল করে। যদিও সিটি কর্পোরেশনের রেজিস্ট্রেশন আছে মাত্র ১৬ হাজার। চ্যাসিস নম্বর না থাকায় একই রেজিস্ট্রেশন (নম্বর) দিয়ে চলছে একাধিক গাড়ি। ফলে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর মোড়, গোরহাঙ্গা রেলগেট, বন্ধগেট, কাদিরগঞ্জ-দড়িখরবোনা মোড়, বর্ণালীর মোড়, লোকনাথ স্কুল মার্কেট মোড়, রাজশাহী কলেজ গেট, সোনাদিঘীর মোড়, আলুপট্টির মোড়, কাজলা মোড়, বিনোদপুর বাজার, সালবাগান বাজার, নওদাপাড়া বাজার ও কোর্ট বাজারগুলোতে অটোরিকশার জট লেগেই থাকে। এই জটলা থামাতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ।

ব্যাটারিচালিত দুই শ্রেণির অটোরিকশা চলে রাজশাহীতে। এর মধ্যে ৮ জন যাত্রী ধারণের ইজিবাইক আছে প্রায় ৩০ হাজার এবং দুইজন যাত্রীবাহী ছোট অটোরিকশা আছে আরও প্রায় ৩৫ হাজার। সবমিলিয়ে অন্তত ৬০ থেকে ৬৫ হাজার। এগুলোর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬২টি ইজিবাইকের নিবন্ধন দেওয়া হয় ২০১১-১৩ সালের মধ্যে। পরে সব নিবন্ধন বাতিল করে ২০২১ সালে অনলাইনে আবেদন জমা নিয়ে ৮ হাজার ৯০০টির ইজিবাইককে নিবন্ধন দেয় রাসিক। সর্বশেষ ইজিবাইক-অটোরিকশা মিলে ১৬ হাজারের নিবন্ধন রয়েছে। তবে আগের সব নিবন্ধন বাতিল হলেও সেই অটোরিকশাগুলো ভুয়া নিবন্ধন নম্বর দিয়ে রাস্তায় রয়েছে।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজশাহী মহানগরে ইজিবাইক (অটো) আছে ১০ হাজার। আর অটোরিকশা আছে ৬ হাজার। এই সংখ্যক অটো ও অটোরিকশা চালানোর লাইসেন্স (অনুমোদন) দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৩০০টির মতো গ্যারেজ রয়েছে।

উজ্জল কুমার নামে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, যানজটের মূল কারণ অতিরিক্ত অটো ও অটোরিকশা। অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি অটো-অটোরিকশা চলাচল করে সড়কে। ফলে যানজট সৃষ্টি হয়। এছাড়া চালকের প্রশিক্ষণ না থাকায় যেনতেনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে ঘটে দুর্ঘটনা। অটোরিকশা চালকরা বেপরোয়া। সড়কে যেখানে-সেখানে থেমে যায়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গাড়ি চালাতে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা। অতিরিক্ত যানজটের কারণে নগরবাসী এবং পথচারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনিয়ন্ত্রিত গতি ও বেপরোয়া চালকদের কারণে দুর্ঘটনাও বেড়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সমাধানের জন্য পদক্ষেপ হিসেবে অনেকেই বলছেন- পরিকল্পিত স্ট্যান্ড স্থাপন। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশাগুলো রাস্তায় চলাচল করলে যানজট অনেকটাই কমে আসবে। আইন ও নিয়ম-কানুনের প্রয়োগ করতে হবে। অটোরিকশা চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন বলছে ব্যাটারিচালিত অটো রয়েছে ১০ হাজার। আসলেই কি তাই? সড়কে দেখে মনে হয় না। বাস্তবে আরও বেশি রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় শুনি একটা কাগজে কয়েকটা অটো চলে। কারণ অটোগুলোর চ্যাসিস নম্বর নেই। অনায়াসে সড়কে নামানো যায়। এর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। তবে আমাদের কাছে ব্যাটারিচালিত অটো বা অটোরিকশার কোনো তথ্য নেই। কারণ এটি অনুমোদনহীন গাড়ি।

এ বিষয়ে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) এর সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশিদ বলেন, একটা অটো চার্জ দিতে ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। এটা ব্যাটারি নতুন অবস্থায়। তবে পুরোনো ব্যাটারিতে বেশি বিদ্যুৎ লাগে। কত অটোর গ্যারেজ আছে সেটার পরিসংখ্যান আপনাকে (প্রতিবেদক) নিতে হলে আরও সময় দিতে হবে।

রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মুখপাত্র রফিকুল আলম বলেন, গেল এক বছরে রাজশাহী জেলায় অটো চুরি কেন্দ্রিক ১২টি মামলা হয়েছে। এছাড়া দুটি দস্যুতাসহ সর্বমোট ১৪টি মামলা হয়েছে জেলার বিভিন্ন থানায়। এনিয়ে পুলিশ কাজ করছে।

 


এই বিভাগের আরো খবর