রাজশাহীতে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিন দিন জোরদার হচ্ছে। প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও দেশীয় মদ। গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীরা। কিন্তু পুলিশের দাবি, অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া অনেক আসামিই অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জের একটি মাদক মামলার কথা। ২০১৮ সালের ১০ জুলাই র্যাব অভিযান চালিয়ে ১ কেজি ২১০ গ্রাম হেরোইনসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা গ্রামের নুরুল ইসলাম (৪৫) নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও তিনটি মাদক মামলা ছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও আগের পেশায় ফিরে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলাটি বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। প্রায় আড়াই বছর আগে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলেও ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র দুজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বারবার সমন জারির পরও অধিকাংশ সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। বর্তমানে আসামিও নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না। ফলে মামলাটি বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
এমন চিত্র শুধু একটি নয়; রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে হাজার হাজার মাদক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে ২৫ হাজার ৬৭১টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন বিভিন্ন আদালতে ৬ হাজার ৭৪৯টি, মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৭ হাজার ১৬০টি, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯ হাজার ৩৫৫টি এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে আরও ৩ হাজার ৬০৭টি মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া বিভাগীয় বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে মাদক নির্মূলে রাজশাহী জেলা পুলিশ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) অভিযান আরও জোরদার করেছে। রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আশিক সাঈদের নির্দেশনা এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছানের তত্ত্বাবধানে ২১ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানের প্রথম দিনে বিভিন্ন থানার পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ২ দশমিক ৫ লিটার দেশীয় মদ, ১১০টি ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৯০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে। একই সঙ্গে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে পাঁচজন এবং বিভিন্ন পরোয়ানাভুক্ত সাতজনসহ মোট ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বিশেষ অভিযানে শুধু মাদক নয়, অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক, চোরাচালান পণ্য উদ্ধারের পাশাপাশি জিআর, সিআর ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে থাকা মুলতবি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও কার্যকর করা হচ্ছে।

এদিকে আরএমপি, রাজশাহী জেলা পুলিশ ও র্যাবের গত তিন মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এপ্রিল মাসে ১৩৫টি, মে মাসে ১৭২টি এবং জুন মাসে ১৭৫টি মামলা হয়েছে। এই তিন মাসে ৪৮২টি মামলায় ৬৭৪ জন আসামির মধ্যে ৫৮৩ জন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৭৫ কেজি গাঁজা, প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, আরও প্রায় ৭ হাজার নিষিদ্ধ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৭০০টির বেশি বোতল অ্যালকোহল। উদ্ধার হওয়া মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি টাকারও বেশি।
আরএমপি, রাজশাহী জেলা পুলিশ ও র্যাবের ছয় মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার মাদক মামলায় ১ হাজার ১০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তার করা হলেও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষীদের অনুপস্থিতি, মামলার জট এবং সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগের কারণে অনেক অভিযুক্ত আবারও মাদক ব্যবসায় ফিরে আসছে। ফলে মাদক নির্মূলে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছে না। তাঁদের মতে, পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিনটি একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলেই মাদকের বিরুদ্ধে টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব।
এ বিষয়ো অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ও রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, রাজশাহী জেলা পুলিশ সারাদেশের মতো মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। জেলা পুলিশের উদ্যোগে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, যেখানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। এসব অভিযানে নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জরিমানাও করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব হলো আসামিদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণ বিচার বিভাগের বিষয়। তবে অনেক আসামি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আসামিরা কীভাবে দ্রুত জামিন পাচ্ছেন, সেটি আদালতের বিষয়।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, নতুন পুলিশ কমিশনার যোগদানের পর থেকে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের পাশাপাশি মাদক নির্মূলে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান দিন দিন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। মাদক বিক্রেতাদের চিহ্নিত করে তাঁদের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে আরএমপি। তালিকা বিশ্লেষণ করে তাঁদের অবস্থান ও গতিবিধি নির্ধারণের পর সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের আটক করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বেশ কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে ১৫টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। তবুও তাঁরা জামিনে মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। কারা জামিনের যোগ্য বা অযোগ্য, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা বিচার বিভাগের রয়েছে। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তাঁরা যদি দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন অথবা দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়ে শাস্তির মুখোমুখি হন, তাহলে পুনরায় এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সামাজিকভাবেও আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের সচেতন করতে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিলে সমাজে মাদক বিক্রেতার সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে। এভাবেই সমাজ থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাদক নির্মূল করা সম্ভব।
রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, বর্তমান সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন অভিযানে আমরা সফলতা অর্জন করেছি এবং বহু মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে আটক করেছি। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আমরা ইতোমধ্যে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছি, যাতে যেসব সীমান্তপথ দিয়ে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে, সেগুলো কার্যকরভাবে চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা যায়। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাঁদের এই অবৈধ পেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, “আমরা মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের আটক করে আদালতে সোপর্দ করছি। কিন্তু তারা খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কারও বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ১০টি, আবার কারও বিরুদ্ধে ১৬টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। মাদক মামলার আইনি কাঠামো যদি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো আরও কঠোর হতো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যেত, তাহলে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।”
রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন দিন দিন আরও কঠোর করা হচ্ছে। তবে রাজশাহীতে যারা মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন, তাঁদের অনেকেরই বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। তিনি মনে করেন, বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁরা মাদক ব্যবসা থেকে সরে এসে অন্য পেশায় যুক্ত হতে উৎসাহিত হবেন। এর ফলে মাদকের বিস্তার কমবে এবং মাদকসেবীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবে আবারও একই পথে ফিরে যান। এছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে নতুন কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে আইন আগের তুলনায় আরও কঠোর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি তৌফিক মোহাম্মদ জাহেদী বলেন, কোনো ব্যক্তিকে মাদকদ্রব্যসহ হাতেনাতে আটক করা হলে আইন অনুযায়ী ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা এই সময়সীমা মেনে চলেন না। ফলে মাদক মামলায় চার্জশিট বা পুলিশ রিপোর্ট দাখিলে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। এছাড়া যেসব পুলিশ সদস্য মামলার সাক্ষী হিসেবে থাকেন, তাঁদের অনেকেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বিচার কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রায় দুই বছর ধরে বিচার কার্যক্রমে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। মাদক মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনজীবী, বিচারক এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ তিন পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।##