রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫৪ অপরাহ্ন

বাড়ছে লোডশেডিং, হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন?

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। তবে প্রথমেই একটা কথা মনে রাখা দরকার—বিদ্যুৎ চলে গিয়ে লিফট থেমে যাওয়া মানেই বড় বিপদ নয়। বরং এ সময় আতঙ্কিত হয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করা বা লিফট থেকে বের হওয়ার তাড়াহুড়ো করাই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

সবসময় নয়। কিছু আধুনিক লিফটে স্বয়ংক্রিয় উদ্ধার ব্যবস্থা থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে এই ব্যবস্থা ব্যাটারির সাহায্যে লিফটকে ধীরে কাছের কোনও তলায় নিয়ে গিয়ে থামাতে পারে এবং দরজা খুলে দিতে পারে। ফলে কয়েক মুহূর্তের জন্য লিফট থেমে যাওয়ার পর আবার চালু হয়ে কাছের তলায় গিয়ে দরজা খুলে দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এমন ব্যবস্থা থাকলে যাত্রীর নিজের কিছু করার দরকার নেই। লিফটকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিতে হবে। দরজা খুলে গেলে নিরাপদে বের হয়ে আসতে পারবেন।

তবে সব লিফটে এই সুবিধা থাকে না। লিফটের ধরন, মডেল, ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং কী ধরনের নিরাপত্তা প্রযুক্তি ইনস্টল করা হয়েছে, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

তাই কারেন্ট যাওয়ার পর লিফট একটু নড়লেই দরজা খোলার জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। লিফট পুরোপুরি কোনও তলায় থামুক এবং দরজা নিজে থেকে খুলুক। দরজা না খুললে বা লিফট মাঝপথেই থেমে থাকলে জরুরি বোতাম ব্যবহার করে সাহায্য চান।

প্রথম কাজশান্ত থাকুন

লিফট থেমে গেলে প্রথমেই নিজেকে শান্ত রাখুন। ধীরে ধীরে শ্বাস নিন। দরজায় ধাক্কাধাক্কি করবেন না, লাফালাফি করবেন না।

বিদ্যুৎ চলে গেলে নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে অনেক লিফট মাঝপথে থেমে যেতে পারে। তাই লিফট থেমেছে মানেই সেটি নিচে পড়ে যাবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।

নিজেকে মনে করিয়ে দিন, আপনি আটকে পড়েছেন, কিন্তু আপাতত কেবিনের ভেতরেই নিরাপদে আছেন।

দরজা নিজে খুলবেন না

লিফটের দরজা একটু খুলে গেলেই অনেকের মনে হতে পারে, ‘এই তো, বের হয়ে যাই।’ কিন্তু লিফট যদি দুই তলার মাঝখানে আটকে থাকে, তাহলে সেই ফাঁক দিয়ে বের হতে গিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তাই দরজা জোর করে খোলা, লাথি মারা কিংবা হাতে টেনে খোলার চেষ্টা করবেন না। লিফট পুরোপুরি কোনও তলার সমতলে থেমেছে কিনা নিশ্চিত না হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।

সবচেয়ে নিরাপদ কাজ হলো, কেবিনের ভেতরে থেকে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করা।

জরুরি বোতাম ব্যবহার করুন

লিফটের ভেতরে সাধারণত জরুরি অ্যালার্ম বা যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকে। লিফট আটকে গেলে সেটি ব্যবহার করুন।

ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে জানান, আপনি কোন ভবনের কোন লিফটে আটকে আছেন। সম্ভব হলে কোন তলার কাছে আছেন, সঙ্গে কতজন আছেন এবং কেউ অসুস্থ বা আহত কি না—সেটাও জানান।

লিফটে জরুরি ফোন বা যোগাযোগের নম্বর দেওয়া থাকলে সেটিও কাজে লাগান।

ভবনে জেনারেটর থাকলে?

অনেক ভবনেই বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু হয়। কিছু ভবনের লিফটও সেই জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব লিফট স্বাভাবিকভাবে চলতে শুরু করবে।

জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অনেক সময় লিফট সীমিতভাবে পরিচালিত হয়। কোনও ভবনে একাধিক লিফট থাকলে একে একে লিফটগুলোকে নির্দিষ্ট তলায় নিয়ে আসার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।

তাই লিফটে আটকে গেলে বাইরে থেকে নিরাপত্তাকর্মী বা ভবন কর্তৃপক্ষ যদি জানান, ‘জেনারেটর চালু হচ্ছে, একটু অপেক্ষা করুন’, তাহলে ভেতরে কোনও জরুরি পরিস্থিতি না থাকলে শান্ত থেকে অপেক্ষা করাই ভালো।

তবে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সর্বজনীন সময় নেই। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট কিংবা আরও বেশি সময়—এটা ভবনের জেনারেটর কত দ্রুত চালু হয়, লিফট সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিনা এবং লিফটের নিজস্ব জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে।

অর্থাৎ শুধু সময় গুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মোবাইল ফোনের ব্যাটারি বাঁচান

মোবাইল ফোন থাকলে প্রথমেই প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে খবর দিন। এরপর অযথা ফোনে কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহার না করে ব্যাটারি বাঁচিয়ে রাখুন।

লিফটে আলো না থাকলে মোবাইলের আলো কাজে লাগতে পারে। তবে সেটি সারাক্ষণ জ্বালিয়ে রাখার দরকার নেই।

আবার উদ্ধারকারী বা নিরাপত্তাকর্মী আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে ফোন সচল রাখাও জরুরি।

অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবেএমন ভয় পাবেন না

লিফটে আটকে গেলে অনেকের প্রথম ভয় হয়, ‘এখানে তো বাতাস নেই, অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে!’

সাধারণ লিফট কেবিন পুরোপুরি বায়ুরোধী নয়। তাই লিফটে আটকে পড়লেই দ্রুত অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে—এমনটা সাধারণত হয় না।

বরং আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত শ্বাস নিতে থাকলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। তাই যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন এবং নিজেকে শান্ত রাখুন।

সিনেমার মতো ছাদ দিয়ে বের হতে যাবেন না

সিনেমায় লিফটের ছাদ খুলে বের হওয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

লিফটের ছাদে ওঠা, দরজা বা কেবিনের কোনও অংশ খুলে ফেলা কিংবা লিফটের শ্যাফটে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।

উদ্ধারকর্মী বা প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ না আসা পর্যন্ত কেবিনের ভেতরেই থাকুন।

বিদ্যুৎ ফিরে এলে কী করবেন?

বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর লিফট আবার চলতে পারে। তখনও শান্ত থাকুন। লিফট কোনও তলায় গিয়ে থামলে দরজা খোলার আগে খেয়াল করুন, কেবিনের মেঝে ও ভবনের মেঝে একই সমতলে আছে কিনা।

দুই জায়গার মধ্যে বেশি ফাঁক বা উচ্চতার পার্থক্য থাকলে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না। বরং আবার সাহায্য চান।

আর লিফট যদি বিদ্যুৎ ফিরে পাওয়ার পর নিজে থেকেই কাছের তলায় গিয়ে দরজা খুলে দেয়, তখন নিরাপদে বের হয়ে লিফটটি আর ব্যবহার না করাই ভালো—বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ তখনও অস্থির থাকলে।

একা থাকলে ভয় লাগতেই পারে

একা লিফটে আটকে গেলে আতঙ্ক আরও বেশি হতে পারে। এমন সময় পরিচিত কাউকে ফোন করে পরিস্থিতি জানাতে পারেন। সম্ভব হলে তার সঙ্গে কথা বলতে থাকুন।

নিজেকে মনে করিয়ে দিন—লিফট থেমে গেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আপনি ভয়াবহ বিপদে আছেন।

আতঙ্ক কমলে পরিস্থিতি সামলানোও সহজ হবে।

সঙ্গে শিশু বা অসুস্থ কেউ থাকলে

লিফটে শিশু থাকলে তাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। তাকে বোঝান যে সাহায্য আসছে এবং দরজা খোলার চেষ্টা করা যাবে না।

কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা আঘাতের মতো সমস্যা হলে দ্রুত বিষয়টি নিরাপত্তাকর্মী বা জরুরি সহায়তাকারীকে জানান।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে জেনারেটর চালু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা নয়, দ্রুত সাহায্য চাওয়াই অগ্রাধিকার।

কখন দ্রুত সাহায্য চাইবেন?

শুধু লিফট আটকে গেছে—এ কারণে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কেবিনে ধোঁয়া বা আগুনের গন্ধ পাওয়া গেলে, কেউ গুরুতর অসুস্থ বা আহত হলে কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত জরুরি সহায়তা নিতে হবে।

এ সময় ফোনে বা জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থায় আপনার অবস্থার গুরুত্ব পরিষ্কার করে জানান।

লোডশেডিংয়ের সময় একটু সতর্ক থাকুন

যেসব এলাকায় নিয়মিত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে, সেখানে লিফট ব্যবহারের সময় একটু বাড়তি সতর্ক থাকা ভালো। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বারবার ওঠানামা করলে সম্ভব হলে লিফট এড়িয়ে চলতে পারেন।

ভবন কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব আছে। লিফটে জরুরি আলো, অ্যালার্ম ও যোগাযোগের ব্যবস্থা সচল রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঠিকঠাক আছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

মনে রাখবেন এই কয়েকটি কথা

লিফটে আটকে গেলে শান্ত থাকুন, জরুরি বোতাম ব্যবহার করুন, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে খবর দিন, দরজা নিজে খোলার চেষ্টা করবেন না এবং লিফটের ছাদ বা শ্যাফটে ওঠার চেষ্টা করবেন না।

আর কারেন্ট চলে যাওয়ার পর লিফট কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার নিজে থেকে কাছের তলায় গিয়ে দরজা খুলে দিলে ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। অনেক লিফটে এমন জরুরি ব্যবস্থা থাকতে পারে। শুধু লিফটকে নিজের মতো কাজ করতে দিন।

ভবনে জেনারেটর থাকলে সেটি চালু হওয়ার জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে। সে সময় বাইরে থেকে নিরাপত্তাকর্মী বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে তা অনুসরণ করুন। তবে কত মিনিট অপেক্ষা করতে হবে—এমন কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। ভেতরে কারও শারীরিক সমস্যা হলে সময় না গুনে দ্রুত সাহায্য চাইতে হবে।

লোডশেডিং কখন হবে, সেটা সবসময় আমাদের হাতে নেই। কিন্তু লিফট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কী করতে হবে, সেটা জানা থাকতে পারে।

তাই লিফট থেমে গেলে প্রথম কাজ দরজা খোলা নয়—নিজেকে শান্ত রাখা। কারণ আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ার চেষ্টার চেয়ে নিরাপদে কেবিনের ভেতরে থেকে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করাই অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।


এই বিভাগের আরো খবর