ফরহাদ মজহার আরও দাবি করেন, এসব সেফ হাউজে আন্দোলনের সমন্বয়কদের মগজধলাই করা হয়েছে। তারা যেন শেখ হাসিনার পদ্যতাগ চান, সেভাবেই তাদের বলা হয়েছে। তিনি এক্ষেত্রে মার্কিন দূতাবাসকে দায়ী করেছেন।
জানতে চাইলে মানবাধিকার সংগঠক রেজাউর রহমান লেনিন বাংলা ট্রিবিউনিকে বলেন, প্রথমত বিগত দিনে ফরহার মজহার নিজেও গুমের শিকার হন। জুলাই আন্দোলনের সময় নাহিদ ইসলামসহ ৪ সমন্বয়ক জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। সেটা তাদের অধিকার আছে। যা কখনও অযৌক্তিক নয়। তখন আমরাও তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিভিন্ন উপায়ে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু সে সময় দূতাবাসগুলো তেমন সাড়া দেয়নি। আর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও সে অর্থে কোনও ভূমিকা পালন করেনি। তবে জাতিসংঘের আবাসিক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ৪ সমন্বয়ককে সহযোগিতা করা হয়েছে। যা অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইনসহ অনেকেই জানতেন। এ সময়ে এসে ফরহাদ মজহার বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সরকার পতনের দাবি শিখিয়ে দিয়েছে। আমার মতে, এটি তথ্যগত বিভ্রাট।
সম্প্রতি অনলাইন গণমাধ্যম আলাপ-এর সঙ্গে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ফরহাদ মজহার জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিদেশি দূতাবাসগুলোর কিছু ভূমিকা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেন। তার দাবি যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু বিদেশি দূতাবাস ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ‘সেইফ হাউজ’ পরিচালনা করেছিল।
ফরহাদ মজহার আরও দাবি করেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস কিছু সেফ হাউজ তৈরি করেছে। মনে রাখেন, এগুলোতে মগজধলাই হয়েছে। যারা সেফ হাউজে ছিল, তারা আমাকে ফোন করেছিল। তারা বলতেছে, আমাদের ওপর চাপ দিতেছে যে, আমরা যেন শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা বলি। ফলে তরুণ ছাত্রদের যারা তখন জীবনের বাঁচাবার জন্য, তাদের সেই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আপনি তাদের বিভিন্ন সেফ হাউজে রেখেছেন এবং প্রতিদিন তাদের আপনি বলছেন যে তোমরা খালি পদত্যাগ চাইবে। এসময় সঞ্চালক জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র কি শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়েছিল? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে।’
আসলে কী চান ফরহাদ মজহার?
জুলাই আন্দোলন ও সমন্বয়কদের সরকার পতনের দাবির নেপথ্যে মার্কিন দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে ফরহাদ মজহারের মন্তব্য ঘিরে নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। কারণ জুলাই আন্দোলনের পর তিনি সরকার পতনের অংশীজন হিসেবে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কিন্তু ইদানীং এখন এসে কেন এমনটি বলছেন, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে তিনি একেক সময় একেক কথা বলেন; যা বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর। সে সময় সমন্বয়কদের জন্য কারও পক্ষ থেকে আলাদাভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়নি। যে যার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে নিরাপত্তা চেয়েছেন। আর ফরহাদ মজহার যা বলছেন, তা সঠিক নয়।’
আদীব আরও দাবি করেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তার (ফরহাদ মজহার) সুপারিশ করা লোকদের অনেক জায়গায় নিয়োগ ও পদায়ন করা হয়েছে। আসলে তিনি কখন কী বলেন বা কী চান, তা বোঝা কঠিন।’
এ বিষয়ে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনপিএ’র কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য বাকী বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফরহাদ মজহার আসলে একেক সময় একেক রকম কথা বলেছেন। তবে তার অনেক কথাই সঠিক নয়। আমার জানামতে, সমন্বয়কদের মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে সরকার পতনের বিষয়ে…তিনি (ফরহাদ মজহার) বোধহয় সেভাবে বলেননি। তবে সেখানে বার্গেনিং হয়েছে; সেটি হয়তো বুঝিয়েছেন।‘
আর আন্দোলনের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তনে ‘মার্কিন পরিকল্পনায়’ বামপন্থিরা অংশ নিয়েছিলেন; এমন কথারও কোনও ভিত্তি নেই বলে মনে করেন বাকী বিল্লাহ। তার ভাষ্য, ‘কারণ বামরা তো সবসময় একই পথে ও দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী আন্দোলন করে আসছে।‘ ফরহাদ মজহারে দুটি দাবিকেই অমূলক বলে দাবি করেন সাবেক এই ছাত্রনেতা।
পডকাস্টে করা মন্তব্যের বিষয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেসব বিষয়ে জানতে চাইলে লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার বাংলা ট্রিবিউকে বলেন, ‘আমি সবসময় একই ধরনের কথা বলেছি। বিগত দিনে শেখ হাসিনা যদি বুঝতো, তাহলে তো ফ্যাসিবাদী আচরণ করতেন না। অতীতে মোসাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ কেউ এখন মন্ত্রিসভার সদস্য। আমি এগুলো বললেই অনেকে প্রশ্ন তোলেন।’
জুলাইয়ে মার্কিন সেইফ হাউজে আন্দোলনের সমন্বয়কদের আশ্রয় দেওয়ার কথা সত্য বলে দাবি করেন ফরহাদ মজহার। তবে সরকার পতনের কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে— সেই পডকাস্টে এমন বক্তব্য অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউ আর ফ্যাসিবাদের উত্থান চাই না।’ তার অভিযোগ, কিছু গণমাধ্যম অহেতুক তার পেছনে লেগে থাকে। অথচ তিনি তার জায়গায় সঠিক আছেন বলেও দাবি ফরহাদ মজহারের।







