সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন

ন্যায়বিচার ছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতা নতুন সংঘাত ডেকে আনতে পারে

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য

কায়সার কামাল বলেন, ন্যায়বিচার ছাড়া জাতীয় সমঝোতা শান্তি নয়, এটি কেবল সংঘাতের মধ্যবর্তী একটি বিরতি।

তিনি বলেন, স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া সাবেক শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবশিষ্টাংশের কারণে বারবার হুমকির মুখে পড়ে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ বা সময়ের আগেই ঐক্যের আহ্বানের বিষয় হতে পারে না।

বিচারের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে কায়সার কামাল বলেন, এই বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। এর উদ্দেশ্য একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বাংলাদেশে আবার এমন কোনো কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার সাহস না পায়।

সমঝোতার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে একেবারে স্পষ্ট থাকতে চাই—ওই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সমঝোতার সুযোগ নেই। দেশের ভেতরে ও বাইরে কিছু মহল পুনর্মিলনের নামে অভিযুক্তদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। এমন ধারণা গ্রহণ করলে দেশ আবার সংঘাতের দিকে যাবে।

অন্য আলোচকদের বক্তব্য

সঞ্চালক জয়সওয়াল বলেন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও পুনর্মিলনকে আলাদা লক্ষ্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তিনটিই পরস্পর-সম্পর্কিত স্তম্ভ। তার মতে, জবাবদিহি যেন প্রতিশোধে পরিণত না হয়। তদন্ত, প্রমাণ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াই জবাবদিহির বৈধতা নিশ্চিত করে। সমঝোতার অর্থ গুরুতর অপরাধ ভুলে যাওয়া নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন।

ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারোরি সিং বলেন, গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। তিনি এটিকে ‘ডেলিভারি ঘাটতি’ বলেন। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহারকে তিনি এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং রাষ্ট্রীয় পদকে জনগণের আমানত হিসেবে দেখার সাংবিধানিক কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।

নিউ এজের নুরুল কবির বলেন, সংঘাত-পরবর্তী সমঝোতার জন্য যৌথ ও স্বচ্ছ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধের দায় স্বীকার ও শাস্তি জরুরি। বাংলাদেশের তিনটি ঐতিহাসিক বিভাজন হিসেবে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেন। তার মতে, দায় অস্বীকার করে, অনুতাপ না দেখিয়ে কিংবা ভুক্তভোগীদেরই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকৃত সমঝোতা সম্ভব নয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মাডো জিলো ফারিদি বলেন, বিচারকে শুধু আইনি কাঠামোয় সীমাবদ্ধ রাখলে সমাজের গভীর সংকটের সমাধান হয় না। দেশটির ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক সমঝোতার পরও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কাঠামোগত বঞ্চনা থেকে যেতে পারে। তাই ক্ষতিপূরণ ও আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করাকেও ন্যায়বিচারের অংশ করতে হবে।

কম্বোডিয়ার সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার বলেন, আনুষ্ঠানিক বিচারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষত নিরাময়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলার সুযোগ, শান্তি জাদুঘর ও প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৯১ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ, এবং ১৯৯৮ সালের উইন-উইন পলিসির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল বলে তিনি জানান।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।


এই বিভাগের আরো খবর