রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

আমিরাতকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আপডেট : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘কঠোরভাবে লক্ষ্যবস্তু’ করার পরিকল্পনার কথা সৌদি আরব ও ওমানকে জানিয়েছিল তেহরান। আবুধাবির সঙ্গে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর দূরত্ব তৈরির স্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে ইরান এই পরিকল্পনা করেছিল। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার এক পর্যায়ে ইরানি কর্মকর্তারা আমিরাতকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। এ সময় আবুধাবির সঙ্গে রিয়াদের মতবিরোধের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন ইরানি কর্মকর্তারা।

ইরানের প্রতি সৌদি আরবের ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশ সংলাপ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত মাসে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেন।

ইরানের এই হুঁশিয়ারি প্রমাণ করে, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার ফাটল সম্পর্কে অবগত এবং আরব রাজতন্ত্রগুলোকে—যারা সবাই মার্কিন অংশীদার; পরস্পরের  থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে কৌশলগত সুবিধা দেখছে।

সৌদি আরব এই অঞ্চলের বৃহত্তম দেশ এবং আমিরাতের মতো তাদেরও বিদেশে প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেই ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছিল সৌদি আরব। সুদানের গৃহযুদ্ধেও দেশ দুটি বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে।

যুদ্ধ চলাকালীন কোনও দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করা থামায়নি। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তান থেকে আসা অস্ত্রের চালান গত মার্চ মাসে পূর্ব লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে। হাফতারের বাহিনীকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে রিয়াদ।

• সৌদি আরব বনাম সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো সাধারণত ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। যদিও এসব দেশ ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার মূল শিকার হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট সম্পদশালী এই দেশটিকে লক্ষ্য করে ইরান অন্তত দুই হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন এবং কুয়েতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার অবস্থান রয়েছে। এসব দেশ মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশে অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানে হামলা না করার অনুরোধ উপেক্ষা করায় আমেরিকার ওপর ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও অঞ্চলটি শেষ পর্যন্ত মার্কিনিদের পাশেই দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

সৌদি আরব ঘাঁটি সুবিধা এবং আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠ অংশীদার পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকেও সমর্থন করেছে।

বিপরীতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রকাশ্যে ও গোপনে তদবির করেছে এবং পাকিস্তান যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে না পারে, সেই চেষ্টাও করেছে।

• আমিরাত-ইসরায়েল জোট

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যকার অংশীদারত্বকেও আরও শক্তিশালী করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে হামলার সময় আমিরাতকে লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য উন্নত অস্ত্র পাঠিয়েছিল ইসরায়েল।

ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের। গত মাসে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিরাজ এলাকায় চীনের তৈরি একটি উইং লুং-২ ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ভেতরে বিমান হামলা চালাচ্ছে কি ন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকে।

ইরানি হামলায় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সংযুক্ত আরব আমিরাত। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এই দেশটিই বিদেশি পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত। গত কয়েক বছরে পর্যটন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দুবাই।

দুবাইয়ের কয়েকটি নামি হোটেল বর্তমানে ডিসকাউন্ট দিচ্ছে এবং সেখানে অতিথির সংখ্যাও অনেক কম। শহরের অন্যতম বিখ্যাত হোটেল বুর্জ আল আরব সংস্কারের জন্য ১৮ মাস ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই হোটেল।

এত ক্ষয়ক্ষতির পরেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার উপসাগরীয় রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেহরানের সঙ্গে লড়াই ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে যাবে বলে আশঙ্কা করছে আমিরাত। যদিও ইরান বর্তমানে তাদের ঘরের দরজায় এক শক্তিশালী শক্তি হিসেবে জেঁকে বসেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে খবরদারি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।


এই বিভাগের আরো খবর