সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট বাড়াতে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ (অ্যাপ্রেইজাল-কাম-ডেভেলপমেন্ট ওয়েল) খনন করা হবে। এ জন্য ৫৯২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ (তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩) খনন’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দেশের গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন দুটি কূপ থেকে ১০ বছরে প্রায় ১০০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং ৬০ হাজার ৪৪৪ ব্যারেল কনডেনসেট পাওয়া যেতে পারে। কোম্পানির বর্তমান কূপমুখের দামে এসব গ্যাস ও কনডেনসেটের আনুমানিক মূল্য ৩৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে গ্যাসের মূল্য ২৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং কনডেনসেটের মূলত ৫৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের গ্যাসের দামে ১০ বছরে উৎপাদিত গ্যাসের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে ৬ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
বিজিএফসিএল বর্তমানে তাদের পরিচালনাধীন ছয়টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৪৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র তিতাসের খনন করা ২৮টি কূপের মধ্যে ২৩টি থেকে দৈনিক প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে পরিচালিত ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিজিএফসিএল চীনের ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (সিএনপিসি) প্রতিষ্ঠান বিজিপি ইনকরপোরেটেডকে এসব জরিপের তথ্য পর্যালোচনার দায়িত্ব দেয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি ১৬টি ইনফিল কূপ এবং সাতটি গভীর কূপ খননের সুপারিশ করে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খননের সরকারি পরিকল্পনার আওতায় তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ কূপ দুটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় বিদেশি ঠিকাদারের মাধ্যমে দুটি কূপ খনন, দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ, গ্যাস সংগ্রহের পাইপলাইন স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট কাজ করা হবে।
২০২৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়বে, শিল্পের বিকাশে সহায়তা করবে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ব্যয় যৌক্তিকীকরণের সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৬৩২ কোটি টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যান্য প্রকল্প
এদিনের একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প এবং প্রতিরক্ষা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় খাল পুনঃখনন এবং নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় আরও তিনটি প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হলো ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট-স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্প, ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি) এবং ৩ হাজার ৯৫১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (তৃতীয় সংশোধিত)।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত যানবাহন ও অপারেশনাল যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় বি-টাইপ কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন নির্মাণ করবে। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৭৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি ১১ লাখ টাকা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (ইনমাস) স্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গ্রামীণ সড়কে ১৫ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পটি তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করে বাস্তবায়ন করবে। এ পর্যায়ে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৫২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
এদিকে ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের পাঁচটি প্রকল্প পরিকল্পনামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছেন বলে একনেক সভায় জানানো হয়।
প্রকল্পগুলো হলো, দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে হৃদ্রোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় যান চলাচলের অবকাঠামো ও সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত), ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন (প্রথম সংশোধিত) এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আধুনিক যানবাহন ও সরঞ্জাম কেনা।
সভায় মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা সভায় অংশ নেন।







