সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন

ক্ষমতা হারানোর দেড় যুগ পরেও কেন নাদিম মোস্তফা মানুষের চোখের মনি ছিল ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : সোমবার, ১ জুলাই, ২০২৪

বিএনপি প্রায় ১৮ বছর ক্ষমতায় নেই। বছরের পর বছর ধরে এডভকেট নাদিম মোস্তফা তার নির্বাচনী এলাকা পুঠিয়া দুর্গাপুরে পা ফেলতেন না। কখনো দলীয় কাজে তার নির্বাচনী এলাকায় গেলে পুঠিয়া দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষ তার নাম শুনলেই দলে দলে ছুটে আসতেন। প্রশ্ন জাগে ক্ষমতা হারানোর দেড় যুগ পরেও কেন তিনি এখনো অত্যান্ত জনপ্রিয়। তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ জানিয়েছে ১৯৯৬ সালের আগে পুঠিয়া দুর্গাপুরের অধিকাংশ রাস্তা ছিল কাচা এবং বর্ষার সময় চলাচলের অযোগ্য। পাশাপাশি বহু গ্রামে মানুষের দৌড় গোড়ায় বিদ্যুৎ ছিল না। প্রথম বার নির্বাচিত হওয়ার পর এ সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করেন। কাউকে চাকরী দিয়ে টাকা নেয়ার নজির নেই। কেউ কোন সাহার্য্যরে জন্য গেলে নিরাশ হয়ে ফিরতেন না। আর এতেই জনগনের মনে জায়গা করে নেন তিনি।


বিএনপির সাবেক বিশেষ সম্পাদক এডভকেট নাদিম মোস্তফা ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ১০ বছর পুঠিয়া দুর্গাপুরের সাংসদ ছিলেন। তার সময়কালে এ দুটি উপজেলার কয়েক হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা নির্মাণ, প্রতি গ্রামের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছে দেন। একই সাথে তার আমলে শত শত স্কুল কলেজ পাঠ্যদান অনুমোদন করান তিনি, শতশত স্কুল এমপিও ভুক্ত এবং অগনিত যুবককে সরকারী, আধা-সরকারী এবং স্কুল কলেজ চাকরী দেন। এসব কাজে কখনোই তিনি টাকা নিতেন না। তার নাম ভাঙ্গিয়ে কোন নেতা টাকা নিলেও সেই টাকা ফেতর দিতে বাধ্য করতেন। এরকম নজির বহু আছে। এসব কারণে তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের মনি কোঠায় ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকাহত তার নির্বাচনী এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
তার নির্বাচনী এলাকার তৃণমুলের নেতারা জানান, ১৯৯৬ সালে ৩২ বছর বয়সে তিনি যখন প্রথম সংসদ সদস্য প্রার্থী হন তখন অবহেলিত পুঠিয়া দুর্গাপুরের ওলি গোলি চষে বেড়িয়েছেন। মানুষের সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনেছেন এবং সেই সব সমস্যা দুর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এলাকার মানুষের চাওয়াকে প্রধান্য দিয়ে প্রথম ৫ বছর কাজ করে গেছেন। এলাকার বয়স্কো নারী পুরুষকে মা বাবা ছাড়া ডাকতেন না। এলাকার যুব সমাজকে ছোট ভাই-বড় ভাই বলে ডেকে আপন করে নিতেন। নারীদেরও ছোট আপু সম্বোধন এবং যথেষ্ট সন্মানের সাথে কথা বলতেন। একারনেই অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হঠে উঠেন।

রাজনৈতিক উত্থান
এডভকেটে নাদিম মোস্তফা স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দাপুটে ছাত্রদলের নেতা হিসেবে রাজশাহীর রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন এবং তাঁর ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বেরগুনে রাজশাহীর রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৮০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯৫ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল রাজশাহী জেলা শাখার দুই মেয়াদে “সভাপতি” ছিলেন। হয়েছিলেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র নাদিম মোস্তফা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের রাজনীতিতে তাঁর অবদান ও সাহসীকতা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। দলের কারণেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিলো বারবার। নাদিম মোস্তফা ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন খুবই সাহসী নেতা। অসংখ্য নেতা তৈরী হয়েছে তাঁর হাত ধরে। যারা এখনো বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সেই সময় বিএনপি জোটে জামায়াত থাকলেও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্র শিবির কর্মকান্ড পছন্দ করতেন না।
১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দূর্গাপুর) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য (৯১ সালে নির্বাচিত) রাজশাহী আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুককে পরাজিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাদিম মোস্তফা। পরবর্তীতে ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। পুঠিয়া-দূর্গাপুর এলাকায় নাদিম মোস্তফার হাত ধরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। যার অনেক অবকাঠামো এখনো দৃশ্যমান এবং পুঠিয়া-দূর্গাপুর এলাকার মানুষের কাছে নাদিম মোস্তফার জনপ্রিয়তা এখনো পাহাড়সম। পুঠিয়া-দূর্গাপুর এলাকার মানুষকে নাদিম মোস্তফা ভালবাসতেন হৃদয় দিয়ে। জনগণও তাকে হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান দিয়েছিলেন।
বিএনপি’র প্রভাবশালী সংসদ সদস্য হিসেবে রাজশাহীর রাজনীতিতে নিজের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরী করেছিলেন জননেতা এ্যাডঃ নাদিম মোস্তফা। ২০০৪ সালে রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র “সাধারণ সম্পাদক” হন নাদিম মোস্তফা। ১/১১ সমর্থিত সেনা সমর্থিত সরকারের সময় নাদিম মোস্তফার সাজা হয়। পরবর্তী কোর্টে স্যারেন্ডার করে কারাগার থেকে বের হয়ে ২০০৯ সালে নাদিম মোস্তফা রাজশাহী জেলা বিএনপি’র “সভাপতি” হন এবং বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে নাদিম মোস্তফাকে বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদক (বিশেষ দায়িত্বে) পদ দেওয়া হয়।
২০০৯ সালে এ্যাডঃ নাদিম মোস্তফা রাজশাহী জেলা বিএনপি’র সভাপতি হওয়ার রাজশাহী জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে ত্যাগী, পরিক্ষিত ও অনেক বঞ্চিত নেতা-কর্মীকে একত্রিত করে মূল ধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করেন যা নাদিম মোস্তফার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বেরগুণেই সম্ভব হয়েছিলো।
নাদিম মোস্তফার সবচেয়ে বড়গুণ ছিল তিনি কর্মীদের আকৃষ্ট করতে পারতেন এবং কর্মীদের বিপদে তিনি পাশে থাকতেন ।
নাদিম মোস্তফাই প্রথম যিনি রাজশাহী জেলা সভাপতি হয়ে রাজশাহী জেলা বিএনপি’র ব্যানারে মহানগরীতে কর্মসূচি পালন করা শুরু করেছিলেন। এখন সে ধারা অব্যাহত আছে। একারনে নাদিম মোস্তফার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত পুঠিয়া দুর্গাপুর সহ রাজশাহীবাসী।


এই বিভাগের আরো খবর