চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে দেশজুড়ে চলছে পুলিশের বিশেষ অভিযান। গত ১ মে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ মাসের ৪ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে ৫৪ হাজার ৭৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকেই গ্রেফতার হয়েছেন ৩ হাজার ৩৭ জন। গ্রেফতারদের মধ্যে বিরোধী দল ও মতের রাজনৈতিক নেতাকর্মী থাকলেও পুলিশ বলছে, তারা তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছেন।
সংসদে ঘোষণার পর শুরু হয় প্রস্তুতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাদক কারবারি, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী এবং অন্যান্য অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব তালিকা তৈরির পর দেশব্যাপী অভিযান শুরু হয়।
ঢাকায় গ্রেফতার তিন হাজারের বেশি
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে বিশেষ অভিযানে মোট ৩ হাজার ৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ২১৫ জন এবং তালিকার বাইরে আরও ৪৫২ জন চাঁদাবাজ রয়েছেন। এছাড়া সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ডাকাতির অভিযোগে ১ হাজার ৪৪ জন এবং মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে ১ হাজার ৩২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
‘মাদক সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সুফল মিলবে না’
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্রেফতার অভিযান চালালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অপরাধের পেছনের সিন্ডিকেট ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। তারা বলছেন, এক মাসে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ হলেও অভিযানের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে অপরাধী চক্র, মাদক সিন্ডিকেট এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর। ফলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগই এখন এই অভিযানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই অভিযানকে অবশ্যই জিরো টলারেন্স নীতিতে পরিচালনা করতে হবে। মাদক ও জুয়া তরুণ সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের পেছনে যারা ইন্ধন জোগান বা সুযোগ সৃষ্টি করেন, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তার মতে, ঘোষিত অভিযান যদি কঠোর ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সরকারের প্রত্যাশা যেমন পূরণ হবে না, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা তৈরি হবে।
‘জিরো টলারেন্স নীতিতেই অভিযান চলছে’
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান পুলিশের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ সদস্য বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যৌথ অভিযান চলছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমান অভিযান মূলত পুলিশের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে।