নারায়ণগঞ্জের একটি ক্লিনিকে নূপুরের অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা হয়। সে সময় চিকিৎসকরা ভুল করে প্রথমে তার মূত্রথলি কেটে ফেলে। পরে সেটি সেলাই করে দেওয়াও হয়, কিন্তু অদক্ষতার জন্য তা যথাযথভাবে মেরামত করা যায়নি। ফলে তার পেটের মধ্যে প্রস্রাব জমতে থাকে। এক সময় প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হতে হতে নূপুরের অবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হলে ২১ এপ্রিল তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এখানে তৎক্ষণাৎ তার অপারেশন করে প্রস্রাবের থলি ঠিক করা হয়। এক মাস চিকিৎসা নিয়ে নূপুর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
শুধু নূপুরই নন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও দেশের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল বিএসএমএমইউ) ঘুরে জানা গেল শহর, উপশহরের মফস্বল এমনকি রাজধানী ঢাকার সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রেও নিম্নমানের গাইনি সার্জনরা কাজ করছেন। অনেক সময় সার্জন ছাড়াই, এমনকি এই বিষয় দক্ষ নয়, এমন ব্যক্তিদের দ্বারা প্রসব ও অপারেশন করানোর কারণে প্রসূতি মায়েদের প্রসব-পরবর্তী জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন, কয়েক বছরে এই হার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন বলেন, এখন বাড়িতে প্রসবের চেয়ে এই সব মানহীন ক্লিনিক ও হাসপাতালে প্রসব করানোর ফলে প্রসব-পরবর্তী জটিলতার হার ও ঝুঁকি অনেক বেশি।
যেসব জটিলতা দেখা যায়
আবাসিক সার্জন মাহবুবুর রহমান রাজিব বলেন, মানহীন প্রতিষ্ঠানে ও বাড়িতে অদক্ষ হাতে নরমাল প্রসব আমাদের এখনো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এর ফলে প্রসূতি মায়ের যোনিপথ, মূত্রাশয় ও মলদ্বারের মাঝখানে কোনো অস্বাভাবিক পথ তৈরি হয়ে প্রসবজনিত ফিস্টুলা হয়, মঝেমধ্যে বাচ্চা জন্মের পর গর্ভফুল বের হয়ে আসে না, তখন অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়। আবার রোগীর প্রেডিমিয়ার টিয়ার হয় বা প্রসবের রাস্তা ছিঁড়ে যায়। এই সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির সৃষ্টি করে।
সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন যা বলেন
বিএসএমএমইউর প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. বেগম নাসরিন বলেন, তার অনেক রোগী গর্ভকালীন ঢাকায় থাকলেও প্রসবের সময় গ্রামে চলে যান। কারণ তাদের ঢাকায় দেখার মতো কেউ থাকে না। আর গ্রামের অনেকেই নিজেদের মতো করে ঘরেই, ডাক্তার নার্স কিংবা দাই ডেকে প্রসব করান। খুব বেশি করলে কাছে কোনো ক্লিনিকে যান। এক্ষেত্রে অদক্ষ হাতে পড়লেই রোগীরা সমস্যায় পড়েন। তারা কোন অবস্থায় কী করতে হবে তা বুঝতে পারেন না। আমাদের দেশে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণে মাতৃমৃত্যুর হার ৩১ শতাংশ এবং একলামশিয়ায় মৃত্যুর হার ২১ শতাংশ।
ডিএমসি হাসপাতালের একই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শিক্ষা গাঙ্গুলী বলেন, গর্ভবতী হওয়া কোনো রোগ নয়, কিন্তু যে কোনো সময় গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। আমাদের চিকিত্সকদের সেদিকে নজর রাখতে হবে। এই দুই ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ মনে করেন, গর্ভকালীন সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী চারবার চিকিৎসককে দেখানো, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও টিকা নেওয়াসহ নিরাপদ প্রসব কোথায় হবে, কীভাবে হবে এসব বিষয় বেশি করে প্রচারণার প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো পাঠ্যসূটিতেও অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জমান জানান, দেশের অন্যতম টার্সিয়ারি হাসপাতালে দেশের সব স্থান থেকে গুরুতর রোগীরা আসে। ক্ষমতার কয়েগুণ বেশি রোগী চিকিত্সা নেন। গত বছর আমরা গুরুতর প্রসূতি মায়েদের চিকিত্সাসেবার জন্য আইসিইউ এবং এসডিইউ (মোট ১৬ শয্যা) চালু করা হয়। সরকার মাতৃমৃত্যু রোধে অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তারপরও এই ঘটনাগুলো রোধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বব্ধতা, প্রচারণা ও শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।