মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে দু’টি: (১) আদিবাসীর সংজ্ঞা কী? (২) আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আদিবাসী বলতে যা বোঝায়, সেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা? আদিবাসী শব্দটির প্রকৃত সংজ্ঞা ও তাদের জাতীয় পরিচয় ও অধিকার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে এবং সেটা অদ্যাবধি জারি আছে। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্ষদে ও বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনার পরে আদিবাসীদের ব্যাপারে পৃথিবীর সব দেশের জন্য প্রযোজ্য সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য কোনও সংজ্ঞায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি বিধায় ‘সেলফ-ডেফিনিশন’ বা আদিবাসী জাতিসমূহের স্ব-সংজ্ঞায়নের হাতে আদিবাসী সংজ্ঞায়নের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে একটা মতৈক্য হয়েছে যে, সাধারণত কোনও একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অনুপ্রবেশকারী বা দখলদার জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বে যারা বসবাস করতো (এটা ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতার সাথে সম্পৃক্ত যা আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) এবং এখনও করে; যাদের নিজস্ব ও আলাদা সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ রয়েছে; যারা নিজেদের আলাদা সামষ্টিক সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা সমাজে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত, তারাই আদিবাসী।
আদমশুমারি অনুযায়ী কেবল দেড়শ বছর আগে ১৮৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র ১.৭৩ শতাংশ; আর পাহাড়ির সংখ্যা ছিল ৯৮.২৭ শতাংশ। তাহলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা কারা? সুতরাং ‘আদি বাসিন্দা’র বিচারেও এতদঞ্চলের ‘আদিবাসী’ এসব আদিবাসী জনগোষ্ঠির পূর্বপ্রজন্মের মানুষরাই। যদিও কোনও অঞ্চলের ‘আদি বাসিন্দা’ কে, তা নিয়ে আদিবাসীর সংজ্ঞায়ন হয় না। যারা বোঝে কিংবা না-বোঝে তর্ক করেন, তাদের জন্য কেবল তর্কের খাতিরে এ যুক্তি দিলাম।
তবে, সংবিধানের আটিক্যাল ২৩-এ গিয়ে এসব জাতিগোষ্ঠীকে জাতি হিসাবে নয় বরং ভিন্ন নামে এক ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাঙালি ছাড়া ভিন্ন জাতিসত্তার যেসব মানুষ বাংলাদেশে বাস করে তারা রাষ্ট্রের ভাষায় ‘বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, এবং সম্প্রদায়’ (বাংলাদেশ সংবিধান ২৩/ক) হিসাবে পরিচিত। অতএব, আজ যখন গোটা দুনিয়া বহুভাষাভাষী মানুষের এবং বহু সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের আদিবাসী মানুষদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে একটি মডার্ন-লিবারেল ডেমোক্রেসি ও ইনক্লুসিভ সমাজের চর্চা করছে, তখন বাংলাদেশে তারা তাদের সাংবিধানিক এবং আইনি অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে। নিজেদের আত্মপরিচয়ের এ সংকট আজকে নতুন নয়। একাত্তরে বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকেই তারা তাদের আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছে। ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ৬(২) ধারায় বাংলাদেশকে যেমন ‘বাঙালির দেশ’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তেমনি ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ‘এদেশের নাগরিক বাঙালি বলিয়া গন্য হইবে’ বলে সকল ‘অবাঙালি’ জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় বিগত পাঁচ দশকেরও অধিক সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে সত্য কিন্তু ‘আদিবাসীদের’ স্বীকৃতি এবং অধিকার বিষয়ের রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কোনও পরিবর্তন হয়নি।
সুতরাং আজকে যে আমরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে পিটিয়ে রক্ত ঝরিয়ে বাঙালিগিরি দেখাচ্ছি এটা হচ্ছে মোটা দাগে বিগত পাঁচ দশক ধরে আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক ও কতৃত্ববাদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফল।আদিবাসী সংক্রান্ত আলোচনায় এবং বিদ্যামান আদিবাসী বিষয়ক বিতর্কটি মোটাদাগে কিছু পপুলার ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আছে। যার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট এখানে আলোকপাত করছি।
এক. বাংলাদেশে আদিবাসী’র প্রশ্ন উঠলেই বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা এবং অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষই কেবল আদিবাসী। কিন্তু সেটা একেবারেই ভুল। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৮টি জেলায় শাঁওতাল, মুন্ডা, ওয়াং, কোড়া, কাদর প্রভৃতি জাতিসত্তা, টাঙ্গাইল-মধুপুর-ভাওয়াল অঞ্চলের গারো জাতি কিংবা সিলেট-মৌলভীবাজার-সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জের মণিপুরী, খাসিয়া, জৈন্তা, পাত্র প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষ বাংলাদেশের আদিবাসী হিসেবে আত্মপরিচয়ের দাবি রাখে। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি-ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ ছাড়াও সমতলের আদিবাসীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। অতএব, ‘আদিবাসী মানেই চাকমা না’!
দুই. আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বললে রাষ্ট্রের কী কী অসুবিধা, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার পরিষ্কার কোনও ব্যাখ্যা কোনও সময়েই দেওয়া হয়নি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে যখন আদিবাসীদের অধিকার সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন চারটি দেশ (আমেরিক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড) এর বিরোধিতা করেছিল তাদের কুৎসিত কলোনিয়াল অতীতের কারণে এবং ১১টি দেশ স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিল। বাংলাদেশ সে ১১টি দেশের মধ্যে একটি। কিন্তু তখন যুক্তি ছিল, আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া একট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার (ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার)। এরপর রাজনৈতিক সরকার আসলো সত্যি কিন্তু আদিবাসী অধিকার সনদ স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু কেন করেনি, তার কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও দেওয়া হয়নি।
তিন. অনেকে মনে করেন, আদিবাসী কোনও একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নাম। বিষয়টি একেবারেই তা নয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো, মণিপুরি, ওরাং, মুন্ডা, খুমি, ম্রো, খেয়াং, লুসাই, পাংখোয় প্রভৃতি জাতিসত্তা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নামেই পরিচিত এবং প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়েই বাঁচতে চায়। কিন্তু আদিবাসী হচ্ছে একটি কালেক্টিভ আইডেন্টিটি বা আমব্রেলা কনসেপ্ট যার মধ্য দিয়ে বাঙালি-ভিন্ন অন্যান্য জাতিসত্তাগুলো একটি নিজস্ব বৃহত্তর পরিচয়ের মেলবন্ধনে পরিচিত হতে চায়। এই যে, নিজেরা একটা সমষ্টিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ে একীভূত হয়ে একটা কালেক্টিভিটির দর্শনে মিলিত হতে চায়, এটা কি তাদের অপরাধ? অন্যায়? আমরা কি কখনও বিষয়টিকে একটি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের আলোয় দেখার চেষ্টা করেছি? নাকি অন্ধ স্বাজাত্যাবোধে তেপান্ন বছর ডুবে থেকেছি? এর উত্তর জানা জরুরি।
চার. ‘আদিবাসীরা বিচ্ছিন্নতাবাদি এবং এদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাবে’- এরকম একটি ডিসকোর্স বাজারে জারি আছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে আসিবাসীরা অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়েছিল। আর্টিকেল ৬ (খ) দিয়ে আদিবাসীদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ও আদিবাসীরা সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হতে চাইলো কিন্তু তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেওয়া হলো না। তাহলে, বিচ্ছিন্নতাবাদ কারা অনুসরণ করেছে? প্রকৃতপক্ষে আদিবাসীরা বিচ্ছিন্নতাবাদি নয়, অন্তর্ভুক্তিবাদি। রাষ্ট্রই একরৈখিক জাতি-নির্মাণ (ন্যাশন-বিল্ডিং) ও মেজরিটারিয়ান দর্শনে রাষ্ট্র-গঠনের (স্টেট-ফরমেশন) প্রক্রিয়ায় ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
পাঁচ. পাঠ্য বইয়ে আদিবাসী শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য কিছু মানুষ আন্দোলন করলো। আন্দোলন করার অধিকার অবশ্যই তাদের আছে। একইভাবে, আদিবাসী শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আদিবাসীরাও আন্দোলন করলো। আদিবাসী শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবিতে যদি আন্দোলন করা যায়, তাহলে সেটা অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন করা যাবে না কেন? এ জন্য তাদেরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করতে হবে কেন? আবার এ রক্তাক্ত করার প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের জলকামান দিয়ে, টিয়ার গ্যাস দিয়ে, সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে দমন করতে হবে কেন? রাষ্ট্র আসলে কার পাহারাদার?
ছয়. এখানে যে জিনিসটা মনে রাখা জরুরি সেটা হচ্ছে, আদিবাসী-বাঙালি দ্বৈরথ তৈরি করে আখেরে কারা লাভবান হচ্ছে? আমার ধারণা যারা আদিবাসীদের আদিবাসী বলা যাবে না বলে আদিবাসীদের মাথা ফাটাচ্ছে তাদের অনেকেই জানে না, আদিবাসীদের আদিবাসী বললে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বাঙালিদের কী ক্ষতি। পরিশেষে বলবো, আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক মানুষের তার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও জাতিসত্তার পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বাঙালিদের যেমন আছে, তেমনি আদিবাসীদেরও আছে।
লেখক: ড. রাহমান নাসির উদ্দিন, নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।







