শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১০ অপরাহ্ন

মক্কা চুক্তির পরও কেন ইসরায়েলের দ্বারে সৌদি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিউজ
আপডেট : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় রীতিমতো নাকানি-চুবানি খাওয়া সৌদি আরব এবার শরণাপন্ন হয়েছে ইসরায়েলের। অন্তত গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সহায়তা ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে সৌদি। ইসরায়েলের তিনটি সংবাদমাধ্যম হায়োম, ওয়ালা এবং দ্য জেরুজালেম পোস্ট কূটনৈতিক একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তবে এর পরিধি নিয়ে স্পষ্ট হওয়াটা জরুরি। প্রতিবেদনে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং হুমকি শনাক্ত-ম্যাপিং সংক্রান্ত সহায়তার কথা বলা হলেও ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপ, বিমান হামলা বা সৈন্য উপস্থিতির কথা বলা হয়নি। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চুক্তিবদ্ধ মিত্রদের কাছ থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় এমন কিছুর বদলে গোয়েন্দা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ সহায়তার অনুরোধ জানানো অনেক কম ব্যয়বহুল এবং সহজেই অস্বীকারযোগ্য এক আবেদন। আর এ কারণেই মক্কা কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার চেয়ে রিয়াদের জন্য এই মাধ্যমের ব্যবহার করা সহজ হয়ে থাকতে পারে। এটি কোনো নতুন মাধ্যমও নয়।

ব্রিটেন, মিসর এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং গোয়েন্দা তথ্য প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সহায়তা বাড়াতে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। যদিও সরাসরি হামলার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন।

ইরানকে কেন্দ্র করে অভিন্ন উদ্বেগ থেকে সৌদি-ইসরায়েল গোপন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের বিষয়টি মক্কা চুক্তির বহু বছর আগে থেকেই বিদ্যমান। এটিকে মক্কা চুক্তির কাঠামোগত ত্রুটির কারণে সৃষ্ট কোনো নতুন পরিস্থিতি নয়, বরং তীব্র চাপের মুখে থাকা বিদ্যমান কোনো গোপন যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বলেই মনে হচ্ছে।

এই চাপ অত্যন্ত বাস্তব এবং বহুমুখী। পেরিম দ্বীপ ছিল সৌদি আরবের কার্যকর তেল রপ্তানি করিডোরগুলোর মধ্যে সর্বশেষ সচল পথ। গত ১২ সেপ্টেম্বর হুথিরা এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এর আগের দিন হুথিদের ড্রোন হামলায় সৌদির পেট্রোলাইন পাইপলাইন অচল হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে মার্কিন-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দৃশ্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।

ব্রিটেন, মিসর এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং গোয়েন্দা তথ্য প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সহায়তা বাড়াতে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। যদিও সরাসরি হামলার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। এই তিন দেশ পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো-ধাঁচের এমন একটি চুক্তি করেছে, যা যেকোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা বলে গণ্য করে। তাহলে রিয়াদ কেন আঙ্কারা বা ইসলামাবাদের বদলে জেরুজালেমের দিকে তাকাচ্ছে?

এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন এবং এর জবাব কেবল চুক্তিটি ‌‘একেবারেই নতুনের’ চেয়েও আরও পূর্ণাঙ্গ হওয়া উচিত। কারণ রিয়াদ কেবল তার নিরাপত্তা কাঠামোর নবীনতম ও অপরিণত অংশটিকেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে না। তাদের কাছে বহু পুরোনো ও কার্যকর সরঞ্জামও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং সম্ভবত তারা এমন এক সক্ষমতা খুঁজছে যা তাদের মুসলিম বিশ্বের অংশীদারদের দেওয়ার মতো অবস্থান নেই।

• অব্যবহৃত একাধিক কৌশল

২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। এটি একটি সচল, দ্বিপাক্ষিক এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ব্যবস্থা; ছয় সপ্তাহের পুরোনো এমন কোনো কাঠামো নয়, যা এখনও তার কার্যপ্রণালীর খসড়া তৈরি করছে। এই সংকটের জন্য রিয়াদ সেটিকেও সক্রিয় করছে না।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাতে একটি বহুপাক্ষিক ও বিশেষ করে হুথি-কেন্দ্রিক জোট পাওয়ার জন্য সৌদি আরবের মক্কা চুক্তিরও প্রয়োজন ছিল না। তারা এটি আরও আগেই তৈরি করে রেখেছিল।

মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহ আগে গত ৩০ জুলাই রিয়াদ ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠন করে। এটি এই ধরনের হুমকি থেকে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব এবং এডেন উপসাগরকে রক্ষা করার জন্য গঠিত ১৪টি দেশের একটি জোট।

এর প্রতিষ্ঠাতা স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে মিসর, জর্ডান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও অন্যান্যদের পাশাপাশি পাকিস্তান এবং তুরস্কের নাম বিশেষভাবে রয়েছে। সুতরাং এই নির্দিষ্ট সংকটের জন্য রিয়াদের সামনে তিনটি পৃথক পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, দ্বিপাক্ষিক সৈন্য মোতায়েন। দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গঠিত বহুপাক্ষিক সামুদ্রিক জোট; যা ইতিমধ্যে মক্কা চুক্তির দুই অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং মক্কা চুক্তি।

অথচ রিয়াদ এই তিনটিকেই পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সেন্টকম-মধ্যস্থতাকারী এক গোপন উপায়ের দিকে ঝুঁকছে। এই ধারাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অপরিপক্বতার চেয়ে রিয়াদ আসলে কী চায় সে সম্পর্কে বেশি আলোকপাত করে; এমন এক গোয়েন্দা সক্ষমতা যা তার আঞ্চলিক অংশীদাররা একক বা সম্মিলিতভাবে সরবরাহ করতে পারবে বলে তারা মনে করে না এবং যা তিনটি কাঠামোর কোনোটিকে প্রকাশ্যে সক্রিয় করার রাজনৈতিক ঝুঁকি না নিয়েই পাওয়া সম্ভব।

• শুধুই প্রস্তুত থাকার বিষয় নয়, সক্ষমতার প্রশ্নও

এর একটি সাধারণ উত্তর হতে পারে, জেরুজালেম যা দিতে পারছে, আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদ তা দিতে সক্ষম নয়। ইসরায়েলের এই সহযোগিতার হাত বাড়ানো মূলত ঠিক এই ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশে তাদের প্রদর্শিত গোয়েন্দা ও আইএসআর অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা। ইসরায়েল ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হরমুজ প্রণালির চারপাশে ইরানি নৌঘাঁটির অবস্থানের ওপর একাধিক স্তরের গোয়েন্দা তথ্য তৈরি করে রেখেছে।

মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই বিশেষ করে লোহিত সাগর-বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে তুলনামূলক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনি। ফলে মক্কা চুক্তি বা এমএমডিএ অংশীদারের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য এবং ইসরায়েলের প্রস্তাবিত গোয়েন্দা তথ্যকে সমতুল্য মনে করাটা বাস্তবতার অতিরিক্ত মূল্যায়ন ছাড়া কিছুই নয়।

এছাড়া আঙ্কারা এবং সেনাবাহিনীর এই সংঘাত থেকে দূরে থাকার একটি গাঠনিক বা কাঠামোগত কারণও রয়েছে; যা স্রেফ প্রাতিষ্ঠানিক অপরিপক্বতার চেয়েও স্পষ্ট। মক্কা চুক্তি যখন চূড়ান্ত হচ্ছিল, ঠিক তখনই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তেহরান সফর করেন। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখে তুরস্ক।

ফলে ইরান-সংলগ্ন কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সুন্নি-নেতৃত্বাধীন অভিযান সক্রিয় করা এই দুই দেশের কোনো একটির পক্ষ নেওয়ার বদলে ভারসাম্য রক্ষার যে ঘোষিত নীতি, তার পরিপন্থী হতো। বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ইসলামাবাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটিতে ইসরায়েল ব্যাপকভাবে অপ্রিয়। সৌদি-ইসরায়েল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের পরোক্ষ বা অপ্রমাণিত সমন্বয়ের আভাসও পাকিস্তানের সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে; দেশটি বর্তমানে মক্কা সচিবালয়েরও নেতৃত্বে রয়েছে। তাই দৃশ্যমানভাবে সম্পৃক্ত না থাকাটা কেবল বিচক্ষণতাই নয়; বরং ইসলামাবাদের জন্য এটি প্রায় বাধ্যতামূলক।

• এখনও নিজের নিয়ম লিখছে মক্কা চুক্তি

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বয়স মাত্র ছয় সপ্তাহ। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে এর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় স্থাপনে সম্মত হন। যার প্রথম তিন বছর একজন পাকিস্তানি মহাসচিব প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং এই জোটের আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’।

এর বাস্তবায়ন পরিচালনার জন্য একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অগ্রগতি এতটুকুই। এই চুক্তি কোনো যৌথ কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী বা নির্দিষ্ট কোনো হামলা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি এবং এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

সেই সাধারণ অপরিপক্বতার চেয়েও বাস্তব চিত্র হলো, তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, আঙ্কারা চুক্তিটি আগামী অক্টোবরে সংসদে তোলা হবে। এর অর্থ চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরও তুরস্কে এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি নাও হতে পারে।

সেই কর্মকর্তা যেভাবে বলেছেন, মানুষ বুঝতে চায় না, তবে আমরা যা প্রতিষ্ঠা করেছি তা কেবল একটি নিরাপত্তা জোট নয়, এটি আসলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এটি কেবল রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়, বরং একটি প্রকৃত আইনি সীমাবদ্ধতা এবং আঙ্কারা সামরিকভাবে অগ্রসর হতে চাইলেও তারা তা করতে পারত; এমন প্রত্যাশাকে এটি সরাসরি খর্ব করে।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, সংস্থার কাঠামো, কার্যপ্রণালী এবং নীতিসমূহ চূড়ান্ত করার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এই ব্যবস্থাকে পরিপক্ক বলে গণ্য করার আগে প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশকে অবশ্যই মূলনীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো নীতিমালা তৈরি শেষ করার পরই এর পরিবর্ধন; যেখানে মিসর, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং বাংলাদেশকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে—প্রক্রিয়াটি শুরু হবে। মক্কা চুক্তিটি একটি আবদ্ধ ও কার্যকর ব্লক হিসেবে কাজ করার বদলে এখনও নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। এতে বোঝা যায় ব্যবস্থাটি কতটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

অন্য কথায়, মক্কা চুক্তি হলো একটি রাজনৈতিক ঘোষণা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কাঠামো মাত্র; যা অন্তত একটি স্বাক্ষরকারী দেশের রাজধানীতে এখনও আইনে পরিণত হয়নি। এটি এখন পর্যন্ত দ্রুত যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কোনো স্থায়ী কার্যপ্রণালীসহ কার্যকর সামরিক জোট নয়।

• তড়িঘড়ি করেনি ন্যাটো নিজেও

ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা এখানে অত্যন্ত উপযোগী। কারণ এই তুলনাই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিকে খণ্ডন করে। ন্যাটোর রয়েছে ৭৫ বছরের সমন্বিত সামরিক কমান্ড, ধারা-৫ এর বিস্তারিত কার্যপ্রণালী এবং অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাস। তা সত্ত্বেও, জোট হিসেবে ন্যাটো সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান লড়াইয়ে কোনো সমন্বিত যোদ্ধা বাহিনী হিসেবে প্রবেশ করেনি।

বরং বহু সদস্য দেশ সংঘাত হ্রাসের ওপর জোর দিয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একটি পরিপক্ক জোটও যদি তার সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যের অনুরোধে স্বয়ংসক্রিয়ভাবে বড় কোনো যুদ্ধে যোগ না দেয়, তাহলে একটি ছয় সপ্তাহের পুরোনো চুক্তি; যার একটি দেশের রাজধানীতে এখনও অনুমোদন পাওয়া বাকি, তা থেকে হুথিদের ওপর সরাসরি হামলার আশা করা অযৌক্তিক।

সম্মিলিত-প্রতিরক্ষা অনুচ্ছেদগুলো খুব কম সময়ই ফায়ার অ্যালার্মের মতো কাজ করে। এর জন্য আক্রান্ত দেশের অনুরোধ, সদস্যদের মধ্যে পরামর্শ এবং সহায়তার রূপ কী হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়।

তাছাড়া হুথিদের হামলাগুলো এমন এক সংজ্ঞাগত প্রশ্ন তোলে যার উত্তর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জনসমক্ষে দেননি; কোনো অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলের ওপর অভিযান পরিচালনা করলে সেটি কি এই চুক্তির ভাষায় বর্ণিত ‘‘সশস্ত্র হামলা’’ বলে গণ্য হবে?

• চুক্তি তাহলে কীসের জন্য?

মক্কা চুক্তিকে একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যবস্থার চেয়ে বরং গভীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক থাকা তিনটি দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা ভালো। রিয়াদ, আঙ্কারা এবং পাকিস্তান কেবল কোনো একক বহিরাগত শক্তির ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতার বাইরে গিয়ে আরও বেশি বিকল্প চায়; যা তৈরি হতে দিন বা সপ্তাহ নয়, বরং বছর লাগে।

তবে এর কোনো কিছুই পরিস্থিতির দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাবকে আড়াল করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ও সক্ষমতার ব্যাখ্যাগুলোকে মেনে নেওয়ার পরও আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সাথে তিনটি পৃথক কাঠামো; দ্বিপাক্ষিক সৈন্য মোতায়েন, একটি সামুদ্রিক জোট এবং স্বয়ং মক্কা চুক্তি—অব্যবহৃত রেখে রিয়াদ যখন ইসরায়েলের দিকে হাত বাড়ায়, তখন তা তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভাবমূর্তির কিছুটা ক্ষতি করেই।

সংকটকালে যে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি স্মরণ করা হয় না, তা আসলে কী কাজের; এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। এটিও মনে রাখা দরকার, এই পুরো বিষয়টি এমন কিছু সংবাদমাধ্যমের অপ্রমাণিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যাদের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের উষ্ণ সম্পর্কের সংকেত দেওয়ার নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে; রিয়াদ বা জেরুজালেম যদি এটি সরাসরি অস্বীকার করে, তাহলে মূল প্রশ্ন অনেকটাই বদলে যায়।

মক্কা চুক্তির সঠিক পরীক্ষা এটি নয় যে চলতি সপ্তাহে তুরস্ক বা পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান উড়েছে কি না। পরীক্ষা হলো, তুরস্ক সংসদীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে কি না, সচিবালয় এখন আলোচনাধীন সনদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি চূড়ান্ত করে কি না এবং ইস্তাম্বুল বৈঠকে নির্ধারিত প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতা ও যৌথ মহড়ার এজেন্ডা তিন দেশ এগিয়ে নিয়ে যায় কি না। আগামী মাসগুলোতে দেখার বিষয় এগুলোই; চলতি সপ্তাহের নীরবতা নয়।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর, জেরুজালেম পোস্ট, রয়টার্স।


এই বিভাগের আরো খবর