রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন

মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার একটি ছোট কলোনিতে বসবাসকারী এই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার চিত্র দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংসারের খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে তার চেয়ে বেশি। ফলে খাবার, বাসাভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী কিংবা শৌখিন পণ্য কেনার মতো টাকা থাকছে না অনেকের হাতে।

ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি সংকটের প্রভাব মিলিয়ে খুচরা বাজারে মন্দা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দোকান খোলা রাখার সময় কমে যাওয়ায় বিক্রির সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

আয় বাড়ছে কম, ব্যয় বাড়ছে বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের মজুরি যে হারে বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তার চেয়ে বেশি হারে। গত আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ওই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে।

অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি উপকরণ ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি নির্ধারণের ঝুড়িতে থাকা ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২০৩টির দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সতর্ক থাকার সুপারিশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মূল্যস্ফীতি আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও মানুষ স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারছে না। জিনিসপত্রের উচ্চ দাম অনেক মানুষকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা থেকেও বিরত রাখছে। আগে যারা পোলাওয়ের চাল কিনে খেতে পারতেন, এখন ২৫০ টাকা কেজি দামে সেই চাল কেনাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। এতে শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর অন্যান্য পণ্য কেনার সামর্থ্য থাকছে না।

তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো জরুরি। তবে মজুরি নির্ধারণে শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ব্যয়, কর্মস্থল এলাকার জীবনযাত্রার খরচ, উৎপাদনশীলতা ও শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।

ছাড় দিয়েও বিক্রি নেই

মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়েছে পোশাকের দোকানগুলোতেও। রাজধানীর বনানী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকানগুলোতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চলছে। কিন্তু সেই ছাড়েও প্রত্যাশিত ক্রেতা পাচ্ছেন না বিক্রেতারা।

বনানীর একটি ফ্যাশন আউটলেটের ব্যবস্থাপক মো. সাফিনের হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। গত বছর ছাড় শুরুর পর যে সময়ে দোকানের তাক প্রায় খালি হয়ে যেত, এবার সেই সময়েও পোশাকে ভরা তাক দেখা যাচ্ছে।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সৌমিক দাসের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের কেনাকাটার ধরন বদলে গেছে। গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতার আনাগোনা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে। যারা আসছেন, তারাও শুধু প্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন। আগে ছাড়ের সময় অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক কিনতেন, এখন সেই প্রবণতা নেই।

অন্যদিকে ফ্যাশন ব্র্যান্ড রাইজের এক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের অক্টোবরে তাদের বিক্রি ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। এবার তা কমে ১৫ লাখ টাকায় নেমেছে। আরেক ব্র্যান্ড ক্যাটস আইয়ের অনলাইন বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

শপিং মলে ক্রেতাসংকট, বন্ধ হচ্ছে দোকান

শুধু ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকান নয়, রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানেও ক্রেতাসংকট দেখা দিয়েছে। শাহ আলী প্লাজা, গ্রিন সিটি মার্কেট, অর্কিড পয়েন্টসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে কমেছে বিক্রি।

মিরপুরের শাহ আলী প্লাজার একটি পোশাকের দোকানের বিক্রেতা জানান, গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এখন বিক্রি নেমে এসেছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। কোনো কোনো দিন বিক্রি ১০ হাজার টাকাও হয় না।

একই মার্কেটের গৃহস্থালি পণ্যের দোকানগুলোতেও বিক্রি কমেছে। একজন ব্যবসায়ী জানান, আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করতেন। এখন তা কমে আট থেকে ১০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারাও আগের মতো কিনছেন না।

ফার্মগেটের গ্রিন সিটি মার্কেটের একজন স্যানিটারি পণ্য ব্যবসায়ী জানান, আগে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এখন তা কমে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় নেমেছে। অনেক দোকানে কর্মচারী নেই। বিক্রি না থাকায় বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যবসায়িক মন্দার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই বিপণিবিতানে একসময় ১৯৮টি দোকান ছিল। বন্ধ হওয়ার আগে চালু ছিল মাত্র ১৭টি। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বিপণিকেন্দ্রটি পরিচালনায় মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো। অথচ সার্ভিস চার্জ বাবদ আদায় হচ্ছিল মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা। দীর্ঘদিন লোকসান ও বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে বিপণিকেন্দ্রটি।

সংসার চালাতেই হিমশিম শ্রমিকদের

আয় ও ব্যয়ের ব্যবধানের কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রায়ও পড়েছে চাপ। আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার পোশাকশ্রমিক রাজিব আহসান জানান, বেতনের টাকায় দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই কষ্ট হচ্ছে। দুই মাস ধরে মাছ কিনে খেতে পারেননি। মাংস কেনা হয় শুধু দুই ঈদে।

আরেক শ্রমিক জামেলা খাতুন জানান, দুই বছরে তার বেতন বেড়েছে মাত্র দেড় হাজার টাকা। অথচ সংসারের খরচ বেড়েছে সাত থেকে আট হাজার টাকা। স্বামী অসুস্থ হয়ে চাকরি হারানোর পর পাঁচ সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব এখন তার একার কাঁধে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাওয়ায় আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিতে হচ্ছে। অনেকেই দোকান থেকে বাকিতে নিত্যপণ্য কিনছেন। মাসের বেতন পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বাসাভাড়া ও দোকানের বকেয়া পরিশোধ করে হাতে টাকা থাকছে না।

একজন শ্রমিকের ভাষায়, সবকিছুর দাম বাড়লে বেতন না বাড়িয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। এমনকি পণ্যের দাম কমানো হলে বাড়তি বেতনের দাবিও করতে হতো না।

বিক্রি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের দাবি

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে অফিস ছুটির পর সন্ধ্যায় মার্কেটে ক্রেতা বেশি আসেন। কিন্তু রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ সময় হারাচ্ছেন।

তিনি বলেন, দোকান ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি বড় বিপণিবিতানগুলো রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ এখন শুধু সাধারণ মানুষের সংসারেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পড়ছে দেশের খুচরা ব্যবসা-বাণিজ্যেও। মানুষের হাতে বাড়তি টাকা না থাকায় কমছে পোশাক, গৃহস্থালি ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে শুধু ছাড় দিয়ে বাজারে গতি ফেরানো কঠিন হবে।


এই বিভাগের আরো খবর