রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। ভাবলাম, মেট্রোরেলে হয়তো ভিড় হবে না। সাত-পাঁচ না ভেবে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা সিরিয়াল। পাখার নিচে দাঁড়িয়ে এক ভাইকে অনুরোধ করলাম, ‘আপনি আমার জন্য একটা টিকিট কাইটেন মতিঝিল থেকে উত্তরা।’ টিকিট নিয়ে ফিরতে ফিরতেই ট্রেন এসে পড়ল। গেট খোলার আগেই দেখি চারপাশে জনারণ্য। মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। এই ভিড়ে আশপাশের প্রচণ্ড চাপের ঠেলায় আমি হালকা-পাতলা মানুষ কীভাবে যে ট্রেনের ভেতরে ঢুকে গেলাম, বুঝতেই পারলাম না। ভেতরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলব, এমন সময় দেখি প্রচুর ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। আমি শক্ত করে হাতল ধরে ধাক্কা ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় একজন বলে উঠল, ‘ওই মিয়া, এত শক্ত করে হাত ধরছেন কেন? হাত ছাড়েন, হাতল ধরেন।’
‘স্যরি’ বলে হাসি দিলাম। সে হাসিটাকে অগ্রাহ্য করে তার হাত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। মানবতার খাতিরে আগ বাড়িয়ে বললাম, ‘ভাইজান, চাপটা কি বেশি লেগেছে?’
‘ধুর মিয়া, কথাই কবেন না আপনে।’
এতক্ষণে দুই-তিনবার ধাক্কা খেয়ে হজমও করে ফেলেছি। এক ভুঁড়িওয়ালা আংকেল ধাক্কা সামলাতে না পেরে আমার দিকেই আসছে। দ্রুত পেছন থেকে কাঁধব্যাগ সামনে এনে দাঁড়ালাম। আমরা মুখোমুখি হলাম। চাপ বাড়তে লাগল, আমি ও আংকেল এগিয়ে যাচ্ছি পরস্পর পরস্পরের দিকে। কাছে আসার গল্পের নায়ক-নায়িকা মনে হচ্ছে! বিরাট সংঘর্ষের শঙ্কায় আছি। কখন কী হয়ে যায়, কে জানে। কাছাকাছি আসতেই ওনার পেট আর আমার ব্যাগ একদম মুখোমুখি হয়ে গেল। একজন আরেকজনকে অন্যায়ভাবে কাতুকুতু দিতে লাগল। ওনার ভুঁড়িতে একটু কাতুকুতু বেশি লাগছে বোধ হয়; এ জন্য উনি রেগেমেগে বলে উঠলেন, ‘ওই মিয়া, আপনের ভুঁড়ি সরান জলদি। এখনই ভুঁড়ি দিয়ে ভুঁড়ি গালিয়ে দেব কিন্তু!’
খাইছে আমারে, ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়ে ভুঁড়ি খুঁজতে লাগলাম। আরেকজনের ভুঁড়িতে হাত পড়ায় সেও বলে উঠল, ‘অসভ্য ছেলেমেয়ে কোথাকার। পেটে হাতাইতাছেন কেন? মতলব কী?’
ছি ছি কী লজ্জা। দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের ভুঁড়ি খুঁজতে লাগলাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। কিন্তু কোথাও ভুঁড়ি পেলাম না। একটু পর মনে হলো, ও আচ্ছা, আমার তো ভুঁড়িই নাই।
আমি হাসিমুখে বললাম, ‘আমার ভুঁড়ি নাই ভাই।’লোকটা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল, ‘ভুঁড়ি নাই মানে? ভুঁড়ি ছাড়া মানুষ আছেনি পৃথিবীতে?’
মিনমিন করে বললাম, ‘নাই তো ভাই!’
‘নাই তো মানে? ফাজলামো করেন মেট্রোতে, হে?’
বিরাট কেলেঙ্কারি হয়ে যেতে পারে। অবস্থা বেগতিক। লোকটা পাগলা কুকুরের মতো কখন ঝাঁপিয়ে পড়ে কে জানে!
‘ভুঁড়ি সরাবেন কি-না কন? এক দুই…!’
‘অবশ্যই, অবশ্যই সরাব ভাই। আপনে তিন বইলেন না। সরাচ্ছি, একটু সময় দেন। অনেক বড় ভুঁড়ি তো। তাই সরাতে একটু কষ্ট হচ্ছে!’
ট্রেন থামল। একটু ভিড়ও কমল। লোকটা আমার ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ও স্যরি, আমি আরও ভাবছিলাম এটা আপনার ভুঁড়ি!’
শিক্ষার্থী, জামিয়াতুল উস্তায এরাবিক ইউনিভার্সিটি, মোহাম্মদপুর, ঢাকা