শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

লোডশেডিং লোকসানের চাপে রাজশাহীর পোশাক ব্যবসা

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সারাদিন দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা কম। বিকেলের পর বেচাকেনা কিছুটা বাড়তে শুরু করলে–তখনি শুরু আরেক সংকট। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে চার-পাঁচবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ বেচাকেনার সময়টুকুও কাজে লাগাতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও ট্যাক্সের চাপ। আবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে লোকসানের মুখে রাজশাহীর পোশাক ব্যবসায়ীরা। এখন ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই করছেন তারা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতার সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিং তাদের ব্যবসায় নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত যখন মার্কেটে ক্রেতা কিছুটা বাড়ে, তখন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দোকানে ক্রেতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিক্রির সম্ভাবনাময় সময়টুকুও নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নির্ধারিত সময়ের আগে দোকান বন্ধ করতে হওয়ায় ব্যবসার সময়ও কমে গেছে।

রাজশাহীর সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেটের বিভিন্ন পোশাকের দোকান ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকা আরডিএ মার্কেটের পোশাকের দোকানগুলোতে বর্তমানে তেমন ভিড় নেই। অধিকাংশ দোকান খোলা থাকলেও অনেক বিক্রেতাকে অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। শুধু পোশাক নয়, জুতা, গহনা, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা ও গৃহস্থালির বিভিন্ন পণ্যের দোকানেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

ব্যবসায়ীরা জানান, সারাদিন দোকান খোলা রাখলেও হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা আসছেন। অনেকে পোশাক দেখছেন, দাম করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত না কিনেই চলে যাচ্ছেন। ফলে দৈনিক বিক্রিও কমে গেছে। তবে বিভিন্ন উৎসব বা বিশেষ মৌসুমকে কেন্দ্র করে বেচাকেনা কিছুটা বাড়ে বলে জানান তারা।

উৎস কালেকশনের মালিক হাবিব বলেন, ‘মাসের শুরুতেই ব্যবসার অবস্থা ভয়াবহ। কাস্টমার একদম নেই বললেই চলে। এত বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসে আছি, কিন্তু কোনো ব্যবসা হচ্ছে না। প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা লোকসান বা ঘাটতি গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।’

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেটুকু সময় কাস্টমার পাওয়া যায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে, তখনই বিদ্যুতের সমস্যা দেখা দেয়। কারেন্ট চলে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা, কখনো দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে চার-পাঁচবারও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এভাবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা কীভাবে চলবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতাম। কিন্তু সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এখন রাত ৮টার দিকে দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসা করার সময়ও কমে গেছে। ব্যবসা থাকলে ব্যাংক ঋণও থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি টানাও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

আরডিএ মার্কেটের লুক কালেকশনের মালিক মো. শামীম বলেন, ‘গত তিন-চার মাস ধরে বর্ষা-বৃষ্টি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে মার্কেটের ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। আমরা অত্যন্ত অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবসা করছি। দোকানের বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতনসহ নিয়মিত খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজস্ব ক্যাশ একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি দিন দিন ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়ছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে হচ্ছে, রাজশাহী মহানগরে বর্তমানে ফুটপাতের দোকান ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মাসের পাঁচ তারিখের পর ফুটপাতের ব্যবসা আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। এর ফলে মানুষ মার্কেটের পরিবর্তে ফুটপাতমুখী হচ্ছে এবং আমাদের দোকানে কাস্টমার কমে যাচ্ছে। অনেক সময় ৫০০ টাকার পণ্য ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে আমরা ঠিকমতো ব্যবসার পুঁজি পর্যন্ত ধরে রাখতে পারছি না।’

শামীম আরও বলেন, ‘আমাদের দোকানের ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে ব্যবসা বাড়েনি। ফলে ব্যয়ের সঙ্গে আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। একপর্যায়ে আমাদের দোকান ছেড়ে দিতে হবে এবং আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব। দিন দিন ব্যাংক ঋণ বাড়ছে, আবার সংসারের খরচও বেড়েছে। একই সঙ্গে দোকানের খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে টিকে থাকব?’

তিনি জানান, ‘সারাদিনের বেচাকেনার অবস্থাও খুব খারাপ। কোনো দিন ১০ হাজার টাকা বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন ৫ হাজার বা ৩ হাজার টাকাও হয়। অনেক দিন কোনো বিক্রিই হয় না বললেই চলে। অথচ প্রতিদিন একটি দোকানের পেছনে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই ঘাটতি থাকছে। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার টাকা লোকসান হলে মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা ঘাটতি হয়। অনেক সময় মাসে এক লাখ টাকার কাছাকাছিও লোকসান হচ্ছে।’

ফুটপাতের ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফুটপাতের ব্যবসা অবশ্যই থাকতে পারে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু বর্তমানে ফুটপাতের দোকান এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও সেদিকে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে মার্কেটের ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ফুটপাতের ব্যবসাকে একটি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে এবং একই সঙ্গে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।’

নিউ মার্কেটের পোশাক বিক্রেতা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আগের মতো এখন ক্রেতা পাওয়া যায় না। অনেকেই মার্কেটে না এসে ফুটপাত থেকে কম দামে কাপড় কিনে নেন। ফলে বেচাকেনা অনেকটাই কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে।’

সাহেববাজারের জুতা ব্যবসায়ী আমজাদ বলেন, ‘বেচাকেনা একদম ডাউন। এ বাজারে আমাদের তিনটি দোকান। সবগুলোতেই বিক্রির অবস্থা ভালো না। দিনভর তেমন ক্রেতা থাকে না। তবে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কিছুটা বেচাকেনা হয়। এভাবে চলতে থাকলে লোকসানের মধ্যে পড়তে হবে।’

এদিকে মার্কেটের পাশাপাশি রাজশাহীর বিভিন্ন শোরুমেও ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। শোরুম বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটার জনপ্রিয়তার কারণে শোরুমেও বেচাকেনায় কিছুটা ভাটা পড়েছে।

ইজি ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী নাবিল মোস্তফা বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এখানে বেচাকেনা মোটামুটি আছে। তবে আগে যে পরিমাণে সেল হতো, এখন তেমন সেল নেই। অনেকেই অনলাইনে পোশাক অর্ডার করছেন। ফলে আমাদের বেচাকেনায়ও ভাটা পড়ছে।’

অন্যদিকে কম দামে পোশাক পাওয়ায় অনেক ক্রেতাই ফুটপাতের দিকে ঝুঁকছেন। নিজের জন্য ফুটপাতে টিশার্ট দেখছিলেন আলমগীর। তিনি বলেন, ‘মার্কেটে দাম বেশি। তাই ফুটপাতে টিশার্ট দেখছি। মার্কেটের তুলনায় এখানকার কাপড় এতটা খারাপ না, তবে দাম অনেক কম। কম টাকায় কাপড় কিনতেই এখানে এসেছি।’

এদিকে মার্কেটে অনেক দোকানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীরা জেনারেটর ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাড়তি ডিজেল খরচের কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান বিক্রেতারা।

বিক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিং হওয়ার কারণে দোকানে জেনারেটর লাগিয়েছি। কিন্তু ডিজেলের যে পরিমাণে দাম–এতে আয় ব্যয়ের হিসেব মিলাতে পারছি না। তবুও ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, “আমাদের ব্যবসায়ীরা বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে রয়েছেন। বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। চারদিকে অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরাও স্বাভাবিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
এরপর একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে, মানুষের মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয়-উপার্জন সেভাবে বাড়েনি। সম্প্রতি এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। বর্তমানে আমাদের মার্কেটগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা ছাড়া অনেক মার্কেটে মানুষ যেতে চায় না।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে স্বল্পমেয়াদে একটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে—কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ থাকবে বা থাকবে না। এ ধরনের পরিকল্পিত রেশনিং স্বল্পমেয়াদে কিছুটা কার্যকর হতে পারে। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়ালে শুধু রেশনিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিষয়টি সরকারকে গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

সবশেষ তিনি বলেন, আমাদের ছোট ছোট উদ্যোক্তারা অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তারা যদি কোনো কারণে ব্যবসা থেকে বিমুখ হয়ে পড়েন বা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।” জাগো নিউজ


এই বিভাগের আরো খবর