বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৮ অপরাহ্ন

শিশু নির্যাতনকারী মানুষ নাকি অমানুষ?

নিউজ ডেস্ক
আপডেট : শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

শিশু নির্যাতনকারীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে— মানুষ হঠাৎ একদিনে নির্যাতনকারী হয়ে ওঠে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা কিছু বিকৃত চিন্তা, ভুল বিশ্বাস আর নৈতিকতার প্রতি ধীরে ধীরে বোধহীন হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানে প্রায়ই বলা হয় Cognitive distortions আর Moral disengagement— অর্থাৎ এমন সব ভাবে ভাবা, যা অপরাধীর কাজকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য ও ‘সে ঠিক আছে’ মনে করতে সাহায্য করে। সে নিজেকে বেশি সময়ই খুব খারাপ মানুষ হিসেবে দেখে না, বরং মনে করে সে হয়তো ‘ছোটখাটো অন্যায় করছে, যা পরে ঠিক করে ফেলবে’, অথবা ‘খুব খারাপ কিছু করছে না’। এই দ্বৈত বাস্তবতার ভেতরেই শিশু নির্যাতনের বীজ রোপিত হয়। পরবর্তীকালে এই নির্যাতনকারী নির্যাতনের অনুকূল পরিবেশ পেলে— অর্থাৎ সে যখন দেখে যে, শিশু নির্যাতন করে পার পাওয়া যায়, এর কঠিন কোনও শাস্তি হয় না, অথবা প্রাথমিকভাবে ধরা না পড়লে, বা গুরুতর কিছু না হলে— শিশু কিছুই বলতে পারবে না, কিংবা প্রমাণ করতে পারবে না, তখন এই সামাজিক উপাদানগুলো তাকে তার অপরাধ প্রবণতার দিকে আরও বেশি করে ধাবিত করে।

নৈতিক বিচ্ছিন্নতার আরেকটি দিক হলো দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘ব্লেম শিফটিং। অনেক যৌন নির্যাতনকারী বলে, ‘আমি আসলে চাইনি, কিন্তু ও এমন আচরণ করেছে যে, নিজেকে থামাতে পারিনি।’ এতে শিশুকে দোষী বানানো হয় তার পোশাক, তার আচরণ, তার নাকি ‘উত্তেজক’ আচরণই অপরাধের কারণ। আরেক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো— পরিস্থিতিকে দায়ী করা অমুক ‘খেয়েছি, নেশা করেছিলাম, মাথা ঠিক ছিল না,’ ‘আমার এত স্ট্রেস, তাই এসব হয়ে গেছে।’ এতে নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কথা বলে; যেন অপরাধটি সে নয়, পরিস্থিতি করেছে। কিন্তু বাস্তবে সবসময়ই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটা মুহূর্ত থাকে, যেখানে সে অন্য পথও বেছে নিতে পারতো।

শৈশবের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিন্তু সরাসরি কারণ নয়। যারা নিজেরা শৈশবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা অনেক সময় ক্ষমতা, স্নেহ ও সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে বিকৃত স্ক্রিপ্ট শিখে ফেলে। তাদের মনের ভেতর ভালোবাসা মানে কখনো ধমক, কখনো ব্যথা, কখনও ভয় এমন মিশ্র অভিজ্ঞতা থাকে। বড় হয়ে যখন সে নিজে ক্ষমতার অবস্থানে যায়, তখন একই স্ক্রিপ্ট অবচেতনে পুনরাবৃত্ত হতে পারে। তবে এটাও জেনে রাখা জরুরি যে, সব ভুক্তভোগী নির্যাতনকারী হয় না, বরং অনেকেই একেবারে বিপরীত পথে যায়, নিজের সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা-সচেতন হয়।

আর এ সব কিছুর অন্তরালে কাজ করে এক ধরনের শেখা নৈতিকতা(!)— ‘বড়রা যা করবে তা-ই ঠিক’, ‘শিশুরা প্রশ্ন করবে না, মানবে’, ‘পরিবারের ভেতরের ব্যাপারে বাইরে কেউ কথা বলতে পারে না।’ যখন পরিবার বা সংস্কৃতির স্তরে এসব ধারণা শক্তিশালী হয়, তখন নির্যাতনকারীর জন্যও নৈতিক সমালোচনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা সহজ হয়। সে জানে যে, সমাজের অনেকেই মারধরকে শাসন হিসেবে দেখে, অনেকেই শিশুর কথাকে গুরুত্ব দেবে না, ফলে তার ওপর সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম। এই নিরাপত্তাবোধ তাকে আরও সাহসী করে তোলে। আবার যদি আশেপাশের লোকজন বারবার বলেন— ‘বাবা-মা কখনও সন্তানের ক্ষতি চায় না’, ‘বড়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা বেয়াদবী’, তাহলে শিশুটির মুখ বন্ধ হয়ে যায়, আর অপরাধীর মানসিক নিরাপত্তা আরও মজবুত হয়।

ধীরে ধীরে এই সব বিকৃত বিশ্বাস একজন মানুষের ভেতরের নৈতিক ভিত্তিকে অসাড় করে দেয়। একদিক দিয়ে সে হয়তো ধর্মকর্ম করে, দান-খয়রাতও করে, অপরদিকে গোপনে শিশু নির্যাতন চালায়, দুই বাস্তবতা একসঙ্গে রেখে চলে। তার মন এই দ্বৈততা সামলে নিতে পারে কারণ সে নিজের কাছে যুক্তি বানিয়ে রেখেছে— ‘বাকি সব ক্ষেত্রে আমি ভালো, এটা শুধু ছোট একটা ভুল’, ‘আমি তো তাকে খাবার, উপহারও দিই, তাই আমি যা করি তা এতটা খারাপ হতে পারে না।’ এই আত্ম-ন্যায্যতার দেয়াল ভাঙা খুব কঠিন হয়, কারণ তা কেবল তথ্য দিয়ে না, গভীর থেরাপি, আত্মসমালোচনা ও সমাজের কঠোর নৈতিক ভাষা এ সব কিছুর সমন্বয়ে ভাঙতে হয়।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য তাই শুধুমাত্র আইনের কড়াকড়ি যথেষ্ট নয়। মানুষের এই ভেতরের ভাবনাগুলো কোথায় বিকৃত, কোথায় মানুষের ভাবনাগুলো অন্যায়ের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তা স্পষ্ট করে দেখা দরকার। প্যারেন্টিং শিক্ষা, আদর, শাসন ও শিশু নির্যাতন, যৌনতা ও সম্মতি নিয়ে খোলামেলা জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, পরিবারে ক্ষমতা ও সম্পর্ক নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা ইত্যাদি সেই বিকৃত চিন্তার বিপরীতে দাঁড়ানো সুস্থ চিন্তা গঠনে সাহায্য করে। একই সঙ্গে সামাজিক ও নৈতিক অবস্থান থেকেও স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, বয়সে ছোট ও সামর্থ্যে দুর্বল বলে শিশু কোনও মানুষের ‘সম্পত্তি’ নয়, তাকে আঘাত করা বা শোষণ করা কখনোই ভালোবাসা বা শাসন হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে শিশু নির্যাতন বন্ধে এর পেছনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে চাই, তাহলে এ বিষয়ে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে ব্যাপকভাবে সামাজিকভাবে চিন্তা-বদলের প্রচারাভিযান চালাতে হবে। তাতে অন্তত কিছু মানুষের মাথায় গড়ে ওঠা বিকৃত চিন্তার পথ বদলাতে শুরু হতে পারে, যা নতুন করে নির্যাতনের চক্র শুরু হওয়ার আগে তা থামানোর সুযোগ করবে। – আবদুল্লা আল মামুন 


এই বিভাগের আরো খবর