সারা পৃথিবীতে একই দিনে খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন উদযাপিত হয়। কিন্তু মুসলমানদের প্রধান দুটি উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা একই দিনে সারা পৃথিবীতে পালিত হয় না। মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দুনিয়ায় যেদিন ঈদ হয়, বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় ঈদ হয় সাধারণত তার পরদিন। এর কারণে ক্রিসমাস ডে হয় খ্রিষ্টীয় তারিখে—যেটি সূর্যনির্ভর। আর মুসলমানদের প্রধান দুটি উৎসব পালিত হয় আরবি মাসে—যা মূলত চন্দ্রনির্ভর। সূর্য ও চাঁদের এই ব্যবধানের কারণে সারা পৃথিবীতে একই দিনে ঈদ উদযাপিত হয় না। কিন্তু একই দিনে পৃথিবীর সকল দেশে ঈদ পালন করা সম্ভব কি না—তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা আছে।
বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল, বিশেষ করে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রশ্ন হলো, তিন ঘণ্টা সময় ব্যবধানের কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে যে কারণে বাংলাদেশে ফজর, আসর ও মাগরিবের নামাজ পড়া যায় না, সেই একই যুক্তিতে কী করে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে বাংলাদেশের কিছু মানুষ ঈদের নামাজ পালন করেন?
মহানবীর (স.) জন্ম-মৃত্যু, পবিত্র মক্কার অবস্থান এবং ইসলামের বিকাশকেন্দ্রে হিসেবে সৌদি আরবকে সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলত এই যুক্তিতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে একই দিনে ঈদ উদযাপনকে যৌক্তিক মনে করেন। যদিও সৌদি আরবের লোকেরা যে সময়গুলোয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, সেই একই সময়ে বাংলাদেশের মানুষ নামাজ পড়তে পারেন না। কারণ সৌদি আরবের সময়ের চেয়ে বাংলাদেশ তিন ঘণ্টা এগিয়ে। কিন্তু তারপরও অনেক ইসলামি স্কলার মনে করেন, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের উচিত একই দিনে ঈদ পালন করা, যাতে উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় থাকে।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় যেহেতু চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, ফলে যেখানে আগে চাঁদ দেখা যাবে সেখানে আগে ঈদ হবে—এটিই স্বাভাবিক। সেজন্য তিন ঘণ্টা সময় ব্যবধানের কারণে সৌদি আরবের পরেরদিন বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার চাঁদ দেখার জন্য নির্দিষ্ট আলোকপ্রবাহ ও আকাশের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত শুষ্ক হওয়ায় চাঁদ দেখা সহজ হলেও বাংলাদেশে বর্ষা বা মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে চাঁদ দেখা কঠিন হতে পারে।
ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে কেউ কেউ চন্দ্রশাস্ত্রের (Lunar Astronomy) ভিত্তিতে একীভূত পদ্ধতির পক্ষে মত দেন, যাতে একাধিক দেশের চাঁদ দেখার তথ্য ব্যবহার করে ঈদের দিন নির্ধারণ করা যায়। পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইসলাম ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ড. শমসের আলী ২০২২ সালে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইসলাম ধর্মের বিধান মেনেই মুসলিম বিশ্ব একদিনেই ঈদ পালন করতে পারে। তার মতে, চাঁদ নিজের দেশেই দেখতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ইমাম আবু হানিফা ও মহানবীও (স.) বলে গেছেন যে তোমরা একই দিনে রোজা রাখবে ও রোজা ভাঙবে। চাঁদ উঠে গেলে চান্দ্রমাস শুরু। এটা করলেই আর অসুবিধা হবে না। তাড়া মুসলিম দেশগুলোর সংস্থা ওআইসিও একই দিনে রোজা ও ঈদের সুপারিশ করেছে। (বিবিসি বাংলা, ০১ মে ২০২২)।
ঈদ যেহেতু সকল মুসলিমের উৎসব, অতএব একটি দেশের মানুষের অভিন্ন দিনে ঈদ পালন করাই শ্রেয়। সরকারের উচিত এ বিষয়ে একটি সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত দেয়া এবং সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে অথবা সৌদি আরেবর পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের যে রীতি চলে আসছে, সে বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে আসা যাতে বাংলাদেশের সকল মানুষ একই দিনে ঈদ পালন করতে পারেন।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।