রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ন

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, সোহা মনিদের প্রাণ যায়

আপডেট : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

মে মাসের প্রথম দিনটা শুরু হয়েছে ভয়ংকর এক খবর দিয়ে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণা-ভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সায়েন্স’ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনার পদ্ধতি পাল্টায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার’। আর এই সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে সম্প্রতি ২৮০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে দেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হামে আক্রান্ত হয়।

সায়েন্সের সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কারণে সরবরাহে দেরি হওয়ায় বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি থমকে গিয়েছিল। এতে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়।

কিন্তু অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সরবরাহ পদ্ধতিতে একটি ‘বিতর্কিত’ পরিবর্তন আনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করে। অথচ তখন এর তীব্র বিরোধিতা করে ইউনিসেফ সতর্ক করে। সংস্থাটি জানায়, এই পদ্ধতি টিকাদান ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওই দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুত ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল জানিয়ে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স জার্নালকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন ‘যেন এটি না করা হয়’। কিন্তু নূরজাহান বেগম কথা রাখেননি।

আমি আসলে নূরজাহান বেগমের সরকারের সময়ে মাঝে মাঝে ভুলেই যেতাম, এই নামে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পদে কেউ আছেন। এখানে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার না করে পারছি না, বিষয়টি আমি আমার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া আইডিতেও লিখেছি।

সাংবাদিকতাসূত্রে স্বাস্থ্য খাতে কাজ করার সুবাদে এর আগে দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিকবার বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আর করোনার সময়ে তো দিনে-রাতে কথা বলতে হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করা নূরজাহান বেগমকে কোনও দিন তাঁর মোবাইল ফোনে আমি রিচ করতে পারিনি।

বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে দুই লাইনের এক পোস্ট দেওয়াতে আরেক সহকর্মী সাংবাদিক জানালেন, নূরজাহান বেগম তাঁর ফোন কল ধরেছিলেন। ‘তাহলে তো তুমি ভাগ্যবান’ বলে রিপ্লাই করতেই সেই সাংবাদিক বন্ধু জানালেন, ভাগ্যবান কিনা তিনি জানেন না। তবে নূরজাহান বেগমকে প্রশ্ন করতেই আমার সেই কলিগকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জবাব দিয়েছিলেন, এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য তাদের মুখপাত্র রয়েছেন।

‘স্বাস্থ্য খাতের মুখপাত্র কে’ জানতে চাইতে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেছিলেন, ‘সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান’। আমাদের স্বাস্থ্যের ইট-কাঠ, ভেতর-বাহিরের যে কী রুগ্ন দশা ছিল, সেটা স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এই উত্তর থেকেই বোঝা যায়।

আমার আসলে এখনও বুঝতে সমস্যা হয়, কোন যোগ্যতায়, কোন ক্ষমতাবলে স্বাস্থ্যের মতো দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি দায়িত্ব নূরজাহান বেগমকে দেওয়া হয়েছিল।

তবে স্বাস্থ্যে যে একেবারেই আশাবাদের কিছুই ছিল না, তা আমি বলবো না। অন্তর্ববর্তী সরকারের নিয়োগগুলোর মধ্যে অন্যতম নিয়োগ ছিল তখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালেযর ফার্মেসী অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। যাকে আমরা ‘খসরু স্যার’ বলে ডাকি। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী পদে যাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে যুদ্ধ করে গেছেন। স্যারের কথা, স্যারের ভাবনা; আমাদের অনেক সাংবাদিকের প্রতিবেদনের অন্যতম রসদ ছিল। তো, ওনার নিয়োগের ভেবেছিলাম, এবার বুঝি রুগ্ন স্বাস্থ্য খাত ভগ্নদশা থেকে বেরিয়ে হৃষ্ট-পুষ্ট হবে। কিন্তু পরে দেখলাম—‘বেশি কিছু আশা করা ভুল/বুঝলাম আমি এতদিনে/ মুক্তি মেলে না সহজে/জড়ালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে’।

ক্ষোভ আর কষ্টের পাহাড় থেকে দেশের কী অবস্থা সেদিকে খানিকটা নজর দেওয়া যাক। শিশুদের মত্যু হচ্ছে, কেবল নিশ্চিত হামে নয়, হামের উপসর্গ নিয়েও থেমে যাচ্ছে কচি প্রাণ। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কী এমন হলো যে, সারা দেশেই শিশুরা এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা, মৃত্যু হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, কেবল একদিনে, শনিবার (২ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টা আরও ১ হাজার ৯৬ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৭২ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর। আমি আবারও লিখছি, আপনারাও পড়েন। একদিনে ১ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।

আর ১৫ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৩৮ হাজার ৩০১ শিশু, তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ৯১১ জন। অবশ্য এদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রও পেয়েছেন ২৩ হাজার ২২৫ জন। এই রোগীদের মধ্যে আবার ৫ হাজার ১৪৬ শিশুর হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। হামে সংক্রমিতদের মধ্যে মারা গেছে ৪৯ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩৫ জনের। মোট মৃত্যু ২৭৭ জনের।

হামের প্রকোপ শুরুর পর ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। আর সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ২০ এপ্রিল থেকে। কিন্তু তাতে কি রক্ষা কিছুটা হচ্ছে, হচ্ছে না তো। অবস্থা এতোটাই ভয়াবহ যে, স্বাস্থ্য বিভাগ প্রথমে ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব হাসপাতালকে নির্দেশ দেয়। সেইসঙ্গে নির্দেশনায় বলা হয়, হামের রোগীকে ফেরাতে পারবে না কোনো হাসপাতাল, সব হাসপাতালকে রোগী ভর্তি করাতে হবে।

অথচ বাংলাদেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে একসময় গর্ব করা হতো। স্বাস্থ্য বিটে কাজ করার সুবাদে জানি, ক্যাম্পেইন হতো, শহর থেকে গ্রাম টিকাদানকে কেন্দ্র করে সাজসাজ রব হতো। সংবাদকর্মীদের আগে থেকে জানানো হতো, কোথায় এটা উদ্বোধন হবে, কত শিশুকে টিকা দেওয়া হবে, কত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করবেন, কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা হবে, কোথাও কোনও সমস্যা হলে কী করতে হবে; সবকিছু।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বভাবে স্বীকৃত। দেশে ২০১০ সাল থেকে শিশুর সব ধরনের টিকার ৮০ শতাংশের বেশি কভার হতো। মাঝে করোনাকালে কিছুটা স্থিতীশীল হওয়া ছাড়া ২০১২ থেকে হাম-রুবেলার সম্মিলিত টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকার কাভারেজ ছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু ওই যে ‘সময়ে এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়’।

সায়েন্স জার্নালের প্রতিবেদনের পর যথারীতি সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কোনও হদিস না পাওয়া গেলেও সায়েদুর রহমান ফেসবুকে তাঁর জবাব দিয়েছেন।

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান টিকার ক্রয়পদ্ধতিসহ নানা বিষয়ে অনেক কঠিন ভাষায় নানা কিছু লিখেছেন। কিন্তু তিনি যেটা বলেননি, সেটা হচ্ছে, দেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হওয়ার থেকে এরকম সংকট তৈরি হয়নি। অথচ টিকা কর্মসূচির মতো জাতীয় নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির টিকা কেনা ব্যাপারে নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি ছিল নাকি টিকাদান কর্মসূচি যেন নিয়মিত থাকে তার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল; সেটাও প্রশ্ন। সেইসঙ্গে টিকার সংকট, টিকাদান কর্মসূচি ব্যহত হওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি আগাম কোনও সতর্কতা জারি হয়েছিল কিনা, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের থেকে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল কিনা-সে প্রশ্নও জরুরি।

কানাডার প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ডা. মারুফুর রহমান অপু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, টিকার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইন্টেরিম সরকারের এক্সপেরিমেন্ট না করলে কি হতো না?

এই চিকিৎসক আরও বলেছেন, ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি না থাকলে ডিরেক্ট প্রক্রিউরমেন্ট ন্যায়সঙ্গত না—এমনটা বলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি যে তৈরি হলো, শত শত শিশু যে মারা গেলো বা মারা যাচ্ছে তার দায় কে নেবে?’

এত বড় সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের হাতে না দিয়ে কেন নিজেরা এক্সপেরিমেন্ট করলেন সেই প্রশ্নও তুলেছেন মারুফুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, হামের টিকা ক্যাম্পেইন ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর সময় পেয়েছে। হেলথ এসিস্টেন্টদের আন্দোলন সত্ত্বেও দুটি নন-ইপিআই টিকা ক্যাম্পেইন করেছে আড়ম্বর করে। তাহলে হামের টিকা ক্যাম্পেইন কেন হলো না? ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন কেন হলো না?’

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কিনা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। কেবল জানি, মাদারীপুর থেকে ঢাকা; চার হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো যায়নি ১০ মাসের সোহামনিকে। শিশুটির মা লিমা আক্তার গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘মেয়েরে শুধু হামের টিকাটা দিতে পারি নাই। এলাকার টিকাকেন্দ্রে তিনবার নিয়ে গেছি। কেন্দ্র থেকে প্রতিবারই বলেছে, সরকারি টিকা নাকি বন্ধ আছে। পরে মেয়েরে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাই। ওইখানে টিকা ছিল, কিন্তু বলছে নির্দিষ্ট টিকাকেন্দ্র থেকেই টিকা নিতে হবে, তারা দিতে পারবে না। এই করতে করতে মেয়ে তো হামে মরেই গেল।’

লিমা আক্তার স্বাস্থ্যের সাবেক বিশেষ সহকারীর ডিরেক্ট পক্রিউরমেন্ট ন্যায়সঙ্গত কিনা সেটা জানেন না, কেবল জানেন, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, সোহামনিদের প্রাণ যায়’।  জাকিয়া আহমেদ, লেখক: সাংবাদিক


এই বিভাগের আরো খবর