সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৩ পূর্বাহ্ন

শেখ হাসিনার ‘ডিসেম্বর বার্তা’: রাজনৈতিক কৌশল নাকি বাস্তব প্রত্যাবর্তন?

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও আইনি বাধ্যবাধকতা

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা থাকলে দেশে ফেরার পর তিনি গ্রেপ্তার হবেন, সেটি ভিন্ন আইনি বিষয়। কিন্তু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে তার কোনো বাধা থাকার কথা নয়, যদি সরকার বাধা না দেয়। তবে, এখানে সরকারের একটি সরাসরি সম্পৃক্ততা লাগবে। কারণ, বর্তমানে তার কাছে পাসপোর্ট বা বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট নেই। বিদেশ থেকে বিমানে আসতে হলে একটি ভ্রমণ দলিল লাগে, যা বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকেই ইস্যু করতে হবে। আর হাইকমিশন সরকারের নির্দেশনার বাইরে কোনো কাজ করবে না।’

dhakapost
ডিসেম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন / ছবি- সংগৃহীত

আগামী ডিসেম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে প্রস্তুতি চললেও, বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। বাতিল হওয়া পাসপোর্ট, ট্রাভেল ডকুমেন্টের বাধ্যবাধকতা এবং আদালতের সাজা বহাল থাকায় তার দেশে ফেরা মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ডিপোর্টেশন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে

পূর্বের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ যখন ভারতে ছিলেন, মামলার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তিনি ট্রাভেল কার্ড চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার ট্রাভেল কার্ড দেয়নি, যার ফলে তিনি সময়মতো আসতে পারেননি। বর্তমানে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসছে। একজন বলছেন, তিনি এলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাবেন এবং তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে; আবার কেউ কেউ বলছেন, তাকে আসতে দেওয়া হবে না।’

সরকার আসলে কী চাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘সুনির্দিষ্টভাবে সরকার কী চাচ্ছে, এটা আমাদের জানা নাই। কিন্তু সরকার যদি আসতে বাধা না দেয়, তাহলে তিনি আসতে পারবেন। সরকার যদি তাকে ট্রাভেল কার্ড দেয় বা পাসপোর্ট দেয়, তাহলে আসতে কোনো বাধা নাই।’

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও রোডম্যাপ

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা উপলক্ষ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। এর আগেও তিনি নিয়মিতভাবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বৈঠক চালিয়ে আসছেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বন্দি না থাকায় দুই দেশের ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’র মাধ্যমে তাকে ফেরত আনা আইনিভাবে জটিল। অন্যদিকে, ডিসেম্বরে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অভ্যর্থনা মিছিল এবং বিরোধী দলগুলোর বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচির আশঙ্কায় মাঠে চরম মুখোমুখি সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সংকট তৈরি হতে পারে

ডিসেম্বরের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এসব বৈঠকে মূলত দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করা, তৃণমূলের সঙ্গে মেলবন্ধন বাড়ানো এবং ঘোষিত ‘নয় দফা’ দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

dhakapost
আমরা তাকে (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে সাজা নিশ্চিত করতে চাই— সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী / ছবি- সংগৃহীত

বৈঠক সূত্র জানায়, যেসব জেলা বা ইউনিটে কমিটি নেই, সেখানে দ্রুত নতুন কমিটি গঠন এবং অসম্পূর্ণ কমিটিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, যেসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিষ্ক্রিয়, সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, হামলা-মামলার শিকার ও কারানির্যাতিত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল দায়িত্বে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো— প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যেন সংগঠিত থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো যায়।

তবে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ বা চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়ে সেই বৈঠকে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশে ফেরার রূপরেখা নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসেনি; নেত্রীর কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলেই সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত তাদের মূল কাজ সংগঠন শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক জনমত তৈরি করা। এছাড়া, শেখ সেলিমের বাসায় ‘গোপন বৈঠক’ হয়েছে বলে বাজারে প্রচারিত খবরকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

রাজনৈতিক কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে একটি কৌশলগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, “বিষয়টিকে আমি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি। দলীয় প্রধান হিসেবে নেতাকর্মীদের ধরে রাখতে, তাদের মনে প্রত্যাশা টিকিয়ে রাখতে এবং দলের রাজনৈতিক মৃত্যু ঠেকানোর জন্য এমন বক্তব্য দেওয়া স্বাভাবিক। এটি মূলত আওয়ামী লীগের একটি ‘পলিটিক্যাল মুভমেন্ট’ বা কৌশলগত অবস্থান।”

মাঠে দৃশ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও কেবল ফেরার একটি ঘোষণাতেই প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য শঙ্কা তৈরি করতে পেরেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতিতে এটি তার বড় কৌশলগত সাফল্য হলেও, শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে এই প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন করতে না পারলে দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা ও সাংগঠনিক মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

তবে, এই কৌশলের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘোষণা দেওয়ার সময়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটিকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবে রূপ দেওয়া বা সঠিকভাবে ‘আর্টিকুলেট’ করা আরও বেশি জরুরি। তা না হলে দলের মূল রাজনীতি ও নেতাকর্মীরা চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবেন। নানামুখী সভা-সেমিনারের মাধ্যমে আসার প্রস্তুতি দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত এই চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্যের ওপর ভরসা করা নেতাকর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।”

dhakapost
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরা না হলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা ও সাংগঠনিক ভিত্তি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে / ছবি- সংগৃহীত

প্রত্যাবর্তনের পেছনের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক স্নিগ্ধা আরও যোগ করেন, ‘শেখ হাসিনার আসলে এই মুহূর্তে নতুন করে হারানোর কিছু নেই। আদালতের দণ্ডাদেশ সত্ত্বেও যদি তিনি দেশে ফিরতে পারেন, তবে রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি নেতৃত্বের আলাদা এক স্থান তৈরি করতে পারবেন বলে হয়তো ভাবছেন। নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং দেশের রাজনীতিতে অতীত অবদানকে পুনরুজ্জীবিত করার এটিই তার শেষ ও মুখ্য সুযোগ বলে তিনি মনে করে থাকতে পারেন।’

এছাড়া, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেভাবে তার সাজা হয়েছে, তা নিয়ে বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মহল ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক সমর্থনকে পুঁজি করেই হয়তো তিনি এই সাহসী সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, আন্তর্জাতিক চাপ সামলে এমন কোনো রায় কার্যকর করা যেকোনো সরকারের জন্যই বেশ কঠিন এক চ্যালেঞ্জ।’

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়ে জটিলতার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। তবে, এক্ষেত্রে একটি বড় আইনি প্রশ্ন জড়িত— সাধারণত কোনো দেশের আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত বা পলাতক আসামি হলে তাকে প্রত্যর্পণের আলোচনা আসে। কিন্তু শেখ হাসিনা যখন দেশ ছেড়ে ভারতে যান, তখন কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো রায় ঘোষণা হয়নি কিংবা তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবেও যাননি। ফলে এই চুক্তির প্রয়োগ নিয়ে বেশকিছু প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা রয়েছে।’

dhakapost

তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে তিনি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যদি তিনি ফিরেই আসেন, তা কোন প্রক্রিয়ায় সম্ভব হচ্ছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।’

সরকারি অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক মহল থেকে নিয়মিত প্রতিক্রিয়া দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক নানা গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনারা ডিসেম্বর নিয়ে এত চিন্তিত কেন? ডিসেম্বর তো আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসে কোনো অপশক্তি দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা ও বিচারপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ থাকবে না। দেশে ফেরার সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আদালতের দেওয়া রায় আইন অনুযায়ী কার্যকর করা হবে। আমরা সবসময়ই চেয়েছি তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ফিরে আসুন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত সরকারের কাছে চিঠি ও তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছিল। আমরা তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে সাজা নিশ্চিত করতে চাই।’

dhakapost

অন্যদিকে, বাতিল হওয়া পাসপোর্ট, মামলা ও আদালতের রায়ের মুখে শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তন কতটা বাস্তবসম্মত— এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ উল আজম সওদাগর বলেন, ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে যে প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরে আসতে চান এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যা প্রত্যাশা করছেন, তা একেবারেই অবাস্তব। নিষিদ্ধ ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবির থেকে আসা এ ধরনের বক্তব্যে কর্মীদের বিভ্রান্ত হওয়া বা বিশ্বাস স্থাপন করা— পুরোটাই রাজনৈতিক অপরিপক্কতার পরিচয়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবেই পা রাখতে হবে। এর বাইরে ভিন্ন কোনো উপায়ে তার ফিরে আসা কিংবা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমি অন্তত দেখি না।’

dhakapost

বন্দি বিনিময় চুক্তি, ভারতের ভূমিকা এবং সরকারের চ্যালেঞ্জ

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘তিনি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে, যেহেতু তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সেহেতু ধরে নেওয়া যায় যে তিনি আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি তো কেবল একক কোনো ব্যক্তি নন, একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা ও সভাপতি। পদত্যাগ বা রাজনীতি ত্যাগ করেননি বলেই রাজনৈতিক প্রয়োজনেই তাকে ফিরতে হবে।’

রাজনীতিতে মামলা-মোকদ্দমার স্বাভাবিকতা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতি করলে জেল-জুলুম কিংবা মামলা-মোকদ্দমা থাকবেই; এটি রাজনীতিতে বড় কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন হলে বহু মামলার গতিপথ যেমন বদলে যায়, তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও অতীতে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়েও দেশে ফিরে এসেছিলেন। সুতরাং মামলা থাকলে তা আদালতেই আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করা হবে এবং আদালতই এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।’

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘিরে সরকারের সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি মন্তব্য করেন, ‘সরকার যদি তাকে দেশে ফিরতে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়, তবে বাস্তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে— তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল (যেমন- জামায়াত, এনসিপি বা অন্যান্য গোষ্ঠী) যদি বিমানবন্দর ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেয়, আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার কর্মী তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরের দিকে এগোয়, তবে মুখোমুখি সংঘাতের চরম ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এড়াতে সরকার চাইলে শেষ মুহূর্তে ঝামেলা এড়ানোর স্বার্থে তার প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত করার পদক্ষেপও নিতে পারে।’

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’র প্রচলিত ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘অনেকেই বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন, কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। কারণ চুক্তির নামই ‘বন্দি বিনিময়’, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আগে অন্য দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত বা বন্দি হতে হবে। শেখ হাসিনা ভারতে বন্দি অবস্থায় নেই; তিনি সেখানে ভারতীয় সরকারের অতিথি (গেস্ট) হিসেবে অবস্থান করছেন।’

dhakapost

তিনি ব্যাখ্যা করে আরও যোগ করেন, “কোনো দেশকে ফেরত পাঠাতে হলে দুটি পথ খোলা থাকে— হয় ভারত সরকার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডিপোর্ট’ (বহিষ্কার) করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মে যে কোনো দেশের অধিকারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যেহেতু ভারতে তিনি অতিথি হিসেবে আছেন, তাই দেশটির সরকার তাকে জোরপূর্বক ডিপোর্ট করছে না। আর ভারত ডিপোর্ট না করলে এবং তিনি ভারতে বন্দি না থাকলে, এই বন্দি বিনিময় চুক্তির প্রয়োগ করে তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো বাস্তব আইনি সুযোগ বা কার্যকারিতা থাকে না।”

আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি ও মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতির সমীকরণ

দলটির বর্তমান রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের নেত্রী দেশে ফিরবেন এবং আমরাও তার সঙ্গে রাজপথে নামব। ইতোমধ্যে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর নানা ধরনের জেল-জুলুম ও নির্যাতন চালানো হচ্ছে; প্রয়োজনে আমরা সবাই জেলে যেতেও প্রস্তুত। নেত্রীর দেশে ফেরা সামনে রেখে আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করছি এবং প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে চাঙ্গা করা হচ্ছে। নিয়মিত অনলাইন সভা-সেমিনার এবং সারাদেশে আটক নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজ অব্যাহত আছে।

“আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ তৈরি রয়েছে এবং দেশে ফেরার আগেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নেত্রী নিজে দেশবাসীকে তার বিস্তারিত পরিকল্পনা জানাবেন” — যোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনার এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার ফলে রাজনীতিতে নতুন কোনো বড় পরিবর্তন আসছে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘উনার এই ঘোষণায় মাঠের রাজনীতিতে হঠাৎ কোনো গুণগত পরিবর্তন না এলেও, রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সর্বস্তরে এক ধরনের অদৃশ্য শঙ্কা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভবত এটাই উনার সবচেয়ে বড় সাফল্য বা কৌশলগত অর্জন।’

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, তিনি বর্তমানে দেশে নেই, এমনকি আওয়ামী লীগেরও মাঠে কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই— সবকিছুই সীমাবদ্ধ অনলাইনের মধ্যে। নিজে সরাসরি সামনে না এসেও কেবল একটি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি আজ সরকারের নীতি-নির্ধারক, প্রশাসন থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দল, সবাইকেই বেশ বড় চিন্তায় ও উদ্বেগে ফেলে দিতে পেরেছেন।

‘এমনকি আপনি যে আজ আমাকে ফোন করে এ বিষয়ে জানতে চাইলেন— এটুকুই তো এই মুহূর্তে রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। একদল হয়তো বলছেন উনার অতীত কর্মকাণ্ডের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই কিংবা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই; কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে উনার দেশে ফেরার একটি ঘোষণাই যখন সবাইকে একইভাবে ভাবিয়ে তুলছে, তখন তো মানতেই হয় যে রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি এখনও একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক এবং তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাস্তবে ম্যাটার করে।

এটি ঢাকা পোস্ট  এর প্রতিবেদন


এই বিভাগের আরো খবর