মাইক্রোপ্লাস্টিক কী এবং কীভাবে তৈরি হয়? বিজ্ঞানীদের সংজ্ঞানুযায়ী, ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট (চাল বা তিলের দানার চেয়েও ক্ষুদ্র) প্লাস্টিকের টুকরোগুলোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো মূলত পলিমার ও বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের মিশ্রণে তৈরি। মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রধানত দুইভাবে তৈরি হয়:
১. প্রাথমিক বা প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: এগুলো শিল্পকারখানায় উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা হয়। যেমন কসমেটিকস ও ফেসওয়াশে ব্যবহৃত ‘মাইক্রোবিডস’, টুথপেস্টের ঘর্ষণকারী উপাদান কিংবা সিনথেটিক কাপড়ের তন্তু।
প্লাস্টিকের মূল উপাদান হলো পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, পলিভিনাইল ক্লোরাইড এবং পলিস্টাইরিন। এসব কৃত্রিম উপাদানের সাথে যোগ করা হয় ক্ষতিকর সব রাসায়নিক প্লাস্টিসাইজার।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের প্রায় প্রতিটি স্তরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিত।
১. খাদ্য ও পানীয়: বোতলজাত পানি, কলের পানি, সামুদ্রিক মাছ, মাংস, লবণ, এমনকি প্রক্রিয়াজাত খাবারেও এর অস্তিত্ব মিলেছে।
২. বায়ুমণ্ডল: শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধুলাবালি এবং সিনথেটিক কাপড়ের সূক্ষ্ম আঁশে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে।
৩. মাটি ও জলাশয়: নদী, নালা, সমুদ্রের পানি এবং কৃষিজমিতে প্রতিনিয়ত মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হচ্ছে।
কীভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে?
মানুষের শরীরে মূলত তিনটি উপায়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে:
১. খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে: মাইক্রোপ্লাস্টিকযুক্ত পানি, মাছ, লবণ বা প্লাস্টিক কন্টেইনারে গরম করা খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এটি সোজা পরিপাকতন্ত্রে চলে যায়।
২. শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে: বাতাসে থাকা অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে প্রবেশ করে।
৩. ত্বকের মাধ্যমে: ত্বকে ক্ষত থাকলে বা অতিরিক্ত মাইক্রোবিডস যুক্ত কসমেটিকস ব্যবহারের মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র কণা ত্বকে ঢুকতে পারে।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢুকে কেবল জমা থাকে না, বরং তা রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
১. কোষের ক্ষতি ও প্রদাহ: মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রক্তনালী ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কোষে ঘর্ষণ ও বিষাক্ততা সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি করে।
২. হরমোনজনিত সমস্যা: প্লাস্টিকে থাকা ‘বিসফেনল এ’ এবং ‘ফ্যাথালেটস’ মানুষের থাইরয়েড, ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেস্টেরন হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে।
৩. ক্যান্সার ও প্রজনন সমস্যা: দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বন্ধ্যাত্ব, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং পাকস্থলী, ফুসফুস ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: অনাক্রম্যতন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শরীর বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
১. দ্য গার্ডিয়ান (২০২২): বিখ্যাত ডাচ বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে পত্রিকাটিতে জানানো হয়, ৮০% সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এটিই প্রমাণ করে প্লাস্টিক কেবল আমাদের পেটে নয়, রক্তপ্রবাহেও ঘুরছে।
২. রয়টার্স ও এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (২০১৯): কানাডার ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতি বছর গড়ে অন্তত ৩৯,০০০ থেকে ৫২,০০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা অজান্তেই খেয়ে ফেলেন। বোতলজাত পানি পানকারীদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ৯০,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
৩. বিবিসি (২০২৩): মানুষের ফুসফুসের গভীরে সূক্ষ্ম মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে, যা শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগের কারণ।
৪. জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস মেটেরিয়ালস (২০২১): গবেষণায় বলা হয়, প্লাস্টিক কণা কেবল বিষাক্ত নয়, এগুলো পরিবেশের অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন ভারী ধাতু ও কীটনাশক) চুষে নেয় এবং শরীরে পরিবাহক হিসেবে কাজ করে সেই বিষ ছড়িয়ে দেয়।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
১. গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশু: গবেষণায় মানব রক্ত ও গর্ভফুল-এ মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে, যা গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক গঠনে বাধা দেয়।
২. শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক: প্লাস্টিকের খেলনা চোষা, প্লাস্টিকের ফিডারে দুধ খাওয়া এবং মেঝেতে ঘুরে বেড়ানোর কারণে শিশুরা সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে।
৩. উপকূলীয় ও প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক: সামুদ্রিক মাছ বেশি খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং প্লাস্টিক রিসাইক্লিং বা তৈরি কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিকরা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
ক্ষুদ্র এই সংকট মোকাবিলায় একক ও সমষ্টিগত উভয় পদক্ষেপই জরুরি:
১. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন: প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল ও কাপের ব্যবহার বন্ধ করে পাট, সুতি বা কাচের সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে।
২. খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা: গরম খাবার বা চা কখনই প্লাস্টিক বা পলিথিনের পাত্রে নেওয়া যাবে না। প্লাস্টিক কন্টেইনারে ওভেনে খাবার গরম করা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
৩. কসমেটিকস নির্বাচন: উপাদান তালিকায় মাইক্রোবিডস, পলিইথিলিন বা পলিপ্রোপিলিন থাকলে সেসব ফেসওয়াশ ও টুথপেস্ট বর্জন করা উচিত।
৪. পানি বিশুদ্ধকরণ: মানসম্মত ফিল্টার ব্যবহার করে পানীয় জল পান করা উচিত।
৫. আইন প্রয়োগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিক পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব ও বায়ো-প্লাস্টিক ব্যবহারে সরকারি কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
সতর্কতা ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প গ্রহণই পারে আমাদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে এই নীরব বিষাক্ত আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে।
ডা. কাকলী হালদার : সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ







