সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন

কতটা বিতর্কিত ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি?

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা মানেই নান্দনিকতা, দিয়েগো ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত বাঁ পায়ের জাদু কিংবা লিওনেল মেসির মহাজাগতিক ফুটবল। সাদা-আকাশি জার্সির বুকে এখন জ্বলজ্বল করছে তিনটি সোনালী তারা। কিন্তু এই তিন তারার প্রথমটি, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে জেতা আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি কি শুধুই গৌরবের? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, কলঙ্কিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এক অধ্যায়?

১৯৭৮ বিশ্বকাপের ঠিক দুই বছর আগে, ১৯৭৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল হোর্হে রাফায়েল বিদেলা। তার স্বৈরাচারী জান্তা সরকারের অধীনে আর্জেন্টিনায় শুরু হয় এক অন্ধকার অধ্যায়, যা ইতিহাসে ডার্টি ওয়ার নামে পরিচিত। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে গুম, খুন এবং নির্মম নির্যাতন করা হয়।

বিশ্ববাসীর চোখ থেকে নিজেদের এই নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আড়াল করতে এবং দেশের ভেতরে স্বৈরাচারী সরকারকে বৈধতা দিতে বিদেলা এই বিশ্বকাপকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। আধুনিক ফুটবলে যাকে আমরা স্পোর্টসওয়াশিং বলি, তার সবচেয়ে বড় এবং প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল এটি। স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে যখন বিদেলা সরকারের নির্যাতন কেন্দ্রে বন্দিদের ওপর অত্যাচার চলত, তখন স্টেডিয়ামে উড়ত আর্জেন্টিনার জয়ের রঙিন কাগজ।

এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে কলঙ্কিত এবং পাতানো বলে ব্যাপকভাবে আলোচিত ম্যাচটি ছিল দ্বিতীয় পর্বের আর্জেন্টিনা বনাম পেরুর লড়াই। ফাইনালে উঠতে হলে ব্রাজিলের চেয়ে গোল ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সমীকরণে আর্জেন্টিনার সামনে লক্ষ্য ছিল প্রায় অবাস্তব! পেরুকে হারাতে হবে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে। সেই সময়ে পেরু দলটির রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

কিন্তু বুয়েনস আইরেসের মাঠে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতেছিল ৬-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে। ম্যাচের পর থেকেই গুঞ্জন ওঠে, সামরিক জান্তা সরকার পর্দার আড়ালে পেরুর খেলোয়াড় ও সরকারকে বিপুল পরিমাণ গম উপহার এবং বিশাল আর্থিক সুবিধা দিয়ে ম্যাচটি কিনে নিয়েছিল।

এই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের সঙ্গে চরম অন্যায় করা হয়েছিল বলে দাবি করেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক। আর্জেন্টিনা যেন ফাইনাল খেলতে পারে, সেই সুবিধার্থে স্বাগতিকদের ম্যাচের সময়সূচি বারবার পরিবর্তন করা হতো। ব্রাজিলের ম্যাচ আগে শেষ হতো, যার ফলে আর্জেন্টিনা ঠিকঠাক জানতে পারত যে পরবর্তী রাউন্ডে যেতে তাদের কত গোলে জিততে হবে। পুরো টুর্নামেন্টে একটি ম্যাচেও না হেরে, অর্থাৎ অপরাজিত থেকেও ব্রাজিল ফাইনাল খেলতে পারেনি। ব্রাজিল নিজেদের নৈতিক চ্যাম্পিয়ন দাবি করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।

পাশাপাশি, টুর্নামেন্ট জুড়ে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলোতে রেফারিদের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিপক্ষের ফাউলে কার্ড না দেওয়া এবং আর্জেন্টিনার সামান্য সুবিধার্থেও পেনাল্টি বা ফ্রি-কিক দেওয়ার প্রবণতা রেফারিদের ওপর জান্তা সরকারের পরোক্ষ চাপের প্রমাণ দেয়।

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচের আগেও আর্জেন্টিনা দল মাঠের বাইরে নোংরা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলেছিল। ডাচ খেলোয়াড়দের বহনকারী বাসটি ইচ্ছা করে বুয়েনস আইরেসের উত্তেজিত এবং উগ্র আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে আনা হয়, যাতে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

এমনকি মাঠে নামার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা অভিযোগ করেন, ডাচ উইঙ্গার রেনে ফন ডে কারখফের হাতের প্লাস্টারটি বিপজ্জনক এবং এটি নিয়ে তিনি খেলতে পারবেন না। এই নিয়ে ম্যাচ শুরু হতে প্রায় ১০ মিনিট দেরি করানো হয় এবং ঘরের মাঠের গ্যালারিকে আরও উত্তপ্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে ম্যাচটি জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ডাচরা এতটাই ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত ছিলেন যে, ম্যাচ শেষে রানার্স-আপ মেডেল না নিয়ে এবং জান্তা প্রধান জেনারেল বিদেলার সাথে করমর্দন না করেই মাঠ ত্যাগ করেন।

মারিও কেম্পেসের জোড়া গোল আর লম্বা চুলের সাম্বা ড্রিবলিং নিশ্চিতভাবেই দুর্দান্ত ছিল। মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে কেম্পেস বা দানিয়েল পাসারেলাদের পারফরম্যান্সকে ছোট করার সুযোগ নেই। কিন্তু মাঠের বাইরের সেই রাজনৈতিক নোংরামি, রক্তের দাগ এবং ৬-০ গোলের রহস্য আজও আর্জেন্টিনার এই প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটিকে পুরোপুরি নিষ্কলঙ্ক হতে দেয় না।

আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপ জয় তাই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একই সাথে ফুটবলীয় রোমাঞ্চের এক অনন্য রূপকথা, আবার ক্ষমতার লোভে ফুটবলকে বলি দেওয়ার এক চরম ট্র্যাজিক দলিল।


এই বিভাগের আরো খবর