তবে সরকারের এই একশে দিনের সফলতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম ১০০ দিনেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানা জনগণের কাছে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে; মজবুত করে চলেছে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।’ তিনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বিষয়ভিত্তিক ও খাতনির্ভর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন, যার ফলে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো একযোগে লক্ষ্য স্থির করে, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনিঃশেষ কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের অভূতপূর্ব এই কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের জীবনমানে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। …সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ইতোমধ্যেই দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘‘দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করে সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে।… সরকারের মন্ত্রিসভা ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি কেবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে। এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ, ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।’’( দৈনিক যুগান্তর, ২৫ মে ২০২৬)
বার বার অথর্নীতিবিদরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য সরকারকে তাগাদা দিচ্ছেন। কারণ এটি এখনও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি করছে বলেই অর্তনীতিবিদরা জানিয়েছেন। তাই জনগণের সামর্থ্যের মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেটি সহনীয় করাও এখন পর্যন্ত চ্যালঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাাপাশি ব্যাংকের মালিকানা এবং পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন এবং দখলের রাজনীতিসহ এবং নানা কারণেই ব্যাংকিং খাতে চলছে নানা ধরনের অস্থিরতা এবং এর পাশাপাশি রয়েছে খেলাপিঋণের ভয়াবহ চিত্র।
বেশ কয়েক জায়গায় অতিরিক্ত তাড়াহুড়া বিএনপির প্রতিশোধপরায়ন রাজনীতির ঝোঁকই স্পষ্ট। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে, যখন ২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেটি সরকার গঠনের পর পরই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে পাস করে একভাবে এটিকে পোক্ত করেছে। তার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা বিশেষ দিবস থেকে যেমন বাদ ছিল ৭ মার্চ, সেটিও জারি রেখেছে বিএনপি। শুধু তা-ই নয়, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকা সন্ত্রাসবিরোধী আইনও ব্যবহার করছে বিএনপি।
তবে সরকারের কর্মকাণ্ড এবং পদ্ধতিতে বিশ্লেষণে বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার বেশ কিছু জায়গায় চরম বেকায়দায় আছে। বিশেষ করে আমেরকিার সঙ্গে করা অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি অনেকটাই গলার কাঁটা হয়েই আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিচেন কেবিনেটকে এই চুক্তির পেছনে দায়ী করে বিভিন্ন উপদেষ্টা এই চুক্তির সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টহীনতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। অপরদিকে এনসিপি এখন এই দায় বিএনপির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং বিশেষ করে কলকাতায় প্রশাসক পরিবর্তন বিএনপিকে নতুন হিসাব-নিকাশের দিকে যেতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে আলোচনা প্রাণ পেলে সেটি নিয়েও যে কিছুটা চাপে আছে সরকার, তা একেবারেই বোঝা যাচ্ছে। এই চাপ শুধু তার একার নয়, এক্ষেত্রে সরকারের ওপর চাপ রাখছে জামায়াত এবং এনসিপি। আর্ন্তজাতিক নড়াচড়া এবং দেনদরবারকেও আমলে নিতে হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের দেশের বাইরে সফর, ইউনূস-তারেক বৈঠক, সব কিছুই পরিষ্কার করছে যে, সরকার গঠন করলেও নানামুখী চাপে আছে বিএনপি। লেখক: জোবাইদা নাসরীন, শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়







