নিহত ৭ জন হলেন- প্যানেল মেয়র নজরুল, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম।

বাবাহীন শৈশব: রোজার গল্প
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে নীরব, অথচ গভীর প্রতিধ্বনি শোনা যায় ১২ বছর বয়সী রোজা আক্তার জান্নাতের জীবনে। তার বাবা গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম সাত খুনের অন্যতম শিকার। বাবার মৃত্যুর এক মাস পর জন্ম রোজার। বাবাকে কখনো দেখেনি সে। তার কাছে বাবা মানে একটি ফ্রেমবন্দী ছবি, আর মায়ের চোখের জল।
রোজার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর বলেন, মাদরাসায় অন্য বাচ্চারা যখন বাবার হাত ধরে আসে, তখন আমার মেয়ে চুপ হয়ে যায়। বাসায় এসে কান্না করে। বলে- আমার বাবা কোথায়?
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করেন নুপুর। সেই আয়ে কোনোভাবে সংসার চলে। শ্বশুরবাড়ির একটি ঘরে থাকেন মা-মেয়ে। কষ্টের মাঝেও মেয়েকে পড়াচ্ছেন।
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটির জীবনে এই ঘটনা এক গভীর ভাঙন তৈরি করে। তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর মনে হতো বাঁচার কোনো অর্থ নেই। প্রতিদিন ভাবতাম কখন আমিও চলে যাব। তিন সন্তানের কথা ভেবে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নেন তিনি। পাঁচ-ছয় বছর পর মনে হলো আমাকে বাঁচতে হবে। সন্তানদের মানুষ করতে হবে।
তিনি বলেন, সেই সময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- সুযোগ পেলে এই হত্যার বিচার নিশ্চিত করবেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সেই কথার ধারাবাহিকতায় আমরা তারেক রহমানের দিকেই তাকিয়ে আছি। তিনি যদি আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেন, তাহলে এই দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা বিচার শেষ হতে পারে। আমরা অন্তত সেই আশাটুকু নিয়ে বেঁচে আছি।
আজও মাঝে মাঝে ভেঙে পড়েন বিউটি। তখন সন্তানরাই সাহস দেয়, আমার মেয়ে বলে, মা আমরাই তো আরেকটা নজরুল। তখন মনে হয়, সে এখনো বেঁচে আছে।
নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, এই বয়সে এসে শুধু একটা ইচ্ছা বিচার দেখে যেতে চাই। পারব কিনা, সেটা জানি না।

মামলার নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন আদালত থেকে জামিন নিয়ে ফিরছিলেন নজরুল ইসলাম। লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় সাদা পোশাকে থাকা একটি দল তার গাড়ি থামিয়ে তাকে ও তার সহযোগীদের তুলে নেয়।
তিন দিন পর তাদের মরদেহ উদ্ধার হয় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। পোস্টমার্টেম ও তদন্তে উঠে আসে নির্মম নির্যাতনের চিত্র। এই ঘটনায় সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে র্যাবের কিছু সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ জনমনে ক্ষোভের জন্ম দেয়।
তদন্তে উঠে আসে, নিহত নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল। দুইজনই ছিলেন একই সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর। আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাবের দ্বন্দ্ব একপর্যায়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ মামলায় ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন- নূর হোসেন ও র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও কমান্ডার এম এম রানা।
পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অন্যদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। কিন্তু এখানেই থেমে যায় বিচার কার্যক্রমের গতি। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে আটকে আছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, প্রক্রিয়াগতভাবে মামলাটি এগিয়েছে, কিন্তু লিভ টু আপিল পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে। আমরা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।







