শুভমন গিলের ক্যাচটা হ্যারিস রউফ মিড-অনে লাফিয়ে ধরার পরেই দুবাই স্টেডিয়ামের গ্যালারির দিকে ঘুরে গেল ক্যামেরা। স্তব্ধ, হতবাক ভারতীয় সমর্থকদের মুখ ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তীরে এসে হয়তো তরী ডুবতে চলেছে। স্কোরবোর্ড দেখাচ্ছিল, ২০ রানের মাথায় তৃতীয় উইকেটটি হারিয়েছে ভারত। শেষ পর্যন্ত তরী ডুবল না। টানা তৃতীয় বার পাকিস্তানকে হারাল এবং এশিয়া কাপ জিতে নিল ভারত। তবে ফাইনাল হল ফাইনালের মতোই। শেষ বল পর্যন্ত টান টান উত্তেজনার, রুদ্ধশ্বাস লড়াই। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও ভারতীয় দল দেখিয়ে দিল, তাদের কখনওই হিসাবের বাইরে রাখলে চলে না।
ভারতের জয়তিলক
পাকিস্তান শুরুটা যে ভাবে করেছিল তাতে মনেই হচ্ছিল তাদের অনেক কিছুর জবাব দেওয়ার আছে। পেসার থেকে স্পিনার, প্রথম ৯ ওভারে ভারতের বোলারদের দাঁড়াতেই দেয়নি তারা। ফখর জ়মান এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত ব্যাটার। কিন্তু ভাল লেগেছে সাহিবজ়াদা ফারহানের খেলা। ভারতের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে অর্ধশতরান করেছিলেন। এ দিন যে ভাবে দাপট দেখালেন তাতে পাকিস্তান দলে তাঁর জায়গা আরও মজবুত হল। ভারতের বিরুদ্ধে অতীতে বার বার ভাল খেলেছেন শোয়েব মালিক। সেই দিকেই এগিয়ে চলেছেন ফারহান। ৯ ওভারে বিনা উইকেটে পাকিস্তান ৭৭ তুলে দেওয়ার পর এমন কোনও ভারতীয় সমর্থক ছিলেন না যাঁর বুক কাঁপেনি।
পাকিস্তানের ওপেনারেরা দাপট দেখার সময় বার বার করে হার্দিক পাণ্ড্যের অভাব বোঝা যাচ্ছিল। চাপের সময় রান আটকাতে পারেন হার্দিক। বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং করতে পারেন। শিবম দুবে অতীতে কোনও দিন বোলিংয়ে ওপেন করেননি। হার্দিকের জায়গায় খারাপ বল করেননি। উল্টো দিক থেকে বুমরাহ রান হজম করছিলেন। চলতি এশিয়া কাপে একেবারেই ভাল খেলতে পারছেন না বুমরাহ। পাকিস্তানের কাছে আগের ম্যাচে ভালই রান হজম করেছেন। এই ম্যাচে শেষ দিকে উইকেট নেওয়া ছাড়া বাকি সময়ে তাঁকে ছন্দহীন লেগেছে। পরিকল্পনাহীন বল করেছেন বুমরাহ। তাঁর গতি কাজে লাগিয়েছেন পাকিস্তানের ব্যাটারেরা।
ভারতকে চাপে ফেলার পরেও পাকিস্তান যে কাজ করল, তা বোধহয় তাদের পক্ষেই সম্ভব। ফারহান অর্ধশতরান করে ফিরে যাওয়ার পরেই সাইম আয়ুবের সঙ্গে জুটি বেধে পাকিস্তানকে ভালই টানছিলেন জ়মান। আয়ুব ফিরতেই কী হল কে জানে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল পাকিস্তানের ব্যাটিং। ১৩তম ওভারে আউট হন আয়ুব। পরের ওভারে ফেরেন হ্যারিস। তার পরের ওভারে জ়মান। এ ভাবে সাত ওভারে বাকি ৯টি উইকেট পড়ে গেল পাকিস্তান। ১১৩/১ থেকে তারা অলআউট হয়ে গেল ১৪৬ রানে। অন্ধ সমর্থকও বিশ্বাস করতে পারেননি যে এমন হতে পারে। যে দুবাই স্টেডিয়াম ম্যাচের শুরু থেকে পাকিস্তান সমর্থকের চিৎকারে মুখরিত ছিল, সেখানেই সবুজ জার্সি পরা দর্শককের মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা গিয়েছে।
পাকিস্তানের ওপেনারদের সামনে ভারতের স্পিনারেরা বড্ড গতিতে বল করছিলেন। ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটারের মতো বল বেরোচ্ছিল কুলদীপ যাদব, বরুণ চক্রবর্তীর হাত থেকে। ১০ ওভারের পর পরিকল্পনা বদলে ফেলল তারা। গতি কমিয়ে দিলেন স্পিনারেরা। তাতেই এল সাফল্য। স্পিনারদের চালিয়ে খেলতে গিয়ে একের পর এক উইকেট দিল পাকিস্তান। ভারতের স্পিনারেরা ১৩ ওভার বল করে ৯৫ রান দিয়ে ৮ উইকেট নিয়েছেন। পাকিস্তানের বেশির ভাগই আউট হয়েছেন খারাপ শট খেলে। তবে ভারতীয় বোলারদের বুদ্ধিকেও অস্বীকার করা যাবে না। গতি কমিয়ে পাক ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করে দিয়েছিলেন তাঁরা।
অভিষেক শর্মা যে সব ম্যাচে জেতাতে পারবেন না এটা বোঝাই যাচ্ছিল। তাই বলে বাকিরাও ও ভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আউট হবেন, যেখানে লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৪৭! শাহিনের প্রথম বলে অভিষেক অল্পের জন্য আউট হতে হতে বেঁচে গেলেন। ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে তখন আর্তনাদ করছেন সুনীল গাওস্কর। বার বার বলছিলেন, দয়া করে তাড়াহুড়ো কোরো না। সব বলে চালাতে যেয়ো না। একটু ধৈর্য দেখাও। কে শোনে কার কথা। অভিষেক পরের ওভারেই ফিরলেন মারতে গিয়ে। আলগা শট খেলতে গিয়ে ফিরলেন সূর্যকুমার। সঞ্জয় মঞ্জরেকর বলে উঠলেন, ভারত কিন্তু খুব হালকা ভাবে নিচ্ছে পাকিস্তানকে। তাঁর কথা সত্যি করে চালাতে গিয়ে ফিরলেন শুভমনও। ভারতের সামনে তখন হারের খাঁড়া ঝুলছে। তিলক না থাকলে এই জয় কোনও ভাবেই সম্ভব ছিল না।
প্রশংসা আরও দু’জনের প্রাপ্য। সঞ্জু স্যামসন এবং শিবম দুবে। টপ অর্ডার যে ভাবে অকারণ তাড়াহুড়ো করে, এই দু’জনেই সেই রাস্তায় হাঁটেননি। শিক্ষা নিয়েছেন। ধৈর্য ধরেছেন। সঞ্জুর সঙ্গে ৫৭ রানের জুটি এবং শিবমের সঙ্গে ৬০ রানের জুটি ভারতকে জিততে সাহায্য করেছে। সেই সময় আর দু’টি উইকেট পড়ে গেলেই হারত ভারত।