মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

নবম পে-স্কেল: কার বেতন কত বাড়বে, কবে মিলবে টাকা

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

একইসঙ্গে নতুন পে-স্কেলকে ঘিরে সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো— বর্তমানে চালু থাকা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ইনসেনটিভ বাতিল করা। ফলে ঘোষিত বেতন বৃদ্ধির হার যতটা বড় দেখাচ্ছে, বাস্তবে চাকরিজীবীদের নিট আয় বৃদ্ধি তার চেয়ে কিছুটা কম হবে।

সচিব কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত রূপরেখা

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটি কাজ করছে। কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো সংক্রান্ত সুপারিশ পর্যালোচনা করছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। এখন প্রজ্ঞাপন জারি, বিধি সংশোধন, হিসাব পুনর্নির্ধারণ এবং সফটওয়্যার সমন্বয়সহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। সে কারণে জুলাই থেকে কার্যকর হলেও অক্টোবর মাসে বর্ধিত বেতন একসঙ্গে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কেন নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন?

সরকারের সর্বশেষ চিন্তাভাবনায় দেখা যাচ্ছে, প্রথম ধাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করেছেন দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রথম পর্যায়ে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের তুলনায় দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হতে পারে। সরকারের যুক্তি হলো, নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলক বেশি বেড়েছে এবং তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে কর্মরত প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার জনের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজারই রয়েছেন দশম থেকে ২০তম গ্রেডে। ফলে এই বৃহৎ অংশের আয় বৃদ্ধি সরাসরি তাদের জীবনমানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিন বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকার একবারে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। কারণ জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, তিন অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী— প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তারা প্রথম বছরে সম্ভাব্য মোট বেতন বৃদ্ধির প্রায় ৪০ শতাংশ সুবিধা পেতে পারেন। দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রথম বছরেই সম্ভাব্য বৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পেতে পারেন। পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে একদিকে সরকারি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের দ্রুত স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।

বিশেষ সুবিধা বাতিলের ফলে প্রকৃত বৃদ্ধি কত?

বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সরকারি চাকরিজীবীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। এর আওতায়— প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তারা মূল বেতনের ১০ শতাংশ, দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছেন। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই সুবিধা আলাদাভাবে থাকবে না। এটি মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

ফলে কাগজে-কলমে মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়লেও প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির হার হবে তুলনামূলক কম। হিসাব অনুযায়ী—প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের কার্যকর বেতন বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৪০ শতাংশ। দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের কার্যকর বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৩৫ শতাংশ।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন— মূল বেতন বাড়ানোর ফলে দীর্ঘমেয়াদে চাকরিজীবীরা বেশি লাভবান হবেন। কারণ পেনশন, গ্র্যাচুইটি, অবসরকালীন সুবিধা এবং ভবিষ্যতের ইনক্রিমেন্ট মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে।

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?

জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতো ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় ব্যয় একসঙ্গে বহন করা সরকারের জন্য কঠিন। ফলে সচিব কমিটি নতুন করে হিসাব-নিকাশ করে সর্বোচ্চ ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

বাজেটে কত টাকা রাখা হয়েছে?

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। পেনশন ও গ্র্যাচুইটি যুক্ত করলে এ বরাদ্দ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়।

এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৪ হাজার ৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, বিভিন্ন ভাতার জন্য ৪৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের একটি বড় অংশ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ ১১ বছর পর বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস সময়ের দাবি ছিল। কারণ এই সময়ে মূল্যস্ফীতি, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় অনেকটাই কমে গেছে। তবে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আহরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা দেওয়ার বর্তমান পরিকল্পনা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকে যুক্তিযুক্ত। কারণ অতিরিক্ত আয় হাতে পেলে তারা তা সরাসরি ভোগ ব্যয়ে ব্যবহার করবেন, যা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও কিছুটা চাঙা করতে পারে।

সামনে কী?

তিনটি পৃথক পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা শেষে আগামী মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হতে পারে। এরপর গেজেট ও প্রজ্ঞাপন জারি হলে বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ খুলে যাবে।

সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১ জুলাই থেকে নবম পে-স্কেল কার্যকর হবে। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে বর্ধিত বেতন পৌঁছাতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। আর সেই সঙ্গে দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি বেতন পুনর্বিন্যাসের অধ্যায়ের সূচনা হবে।


এই বিভাগের আরো খবর