২০২২ সালের ২৯ মার্চ লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপির আয়োজনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায় এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বক্তব্যটি বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজেও প্রকাশ করা হয়।
সবমিলিয়ে ৫৯ সদস্যের মধ্যে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শরিক দলগুলোর মধ্য থেকে মাত্র দুজনকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ‘জাতীয় সরকার’ ধারণাটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপির যুগপৎ জোটের দুই-তিনজন শরিক দলের নেতা বর্তমানে সংসদে রয়েছেন। এছাড়া, শরিক দল থেকে দুজনকে প্রতিমন্ত্রীও করা হয়েছে। তবে, বিএনপির মূল রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় নিলে বাস্তবে জাতীয় সরকার গঠিত হয়নি। আন্দোলনের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিএনপি এখন গুরুত্বসহকারে ভাবছে— এমন কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না।’

সাইফুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পাখি যেমন মনের আনন্দে গান করে, বিএনপিও হয়তো মনে করছে শরিক দলগুলো রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই তাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে। কিন্তু পৃথিবীতে কোনো সমর্থনই শর্তহীন নয়; রাজনৈতিক সমর্থনও কখনও শর্তহীন হতে পারে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের যুগপৎ সঙ্গীদের সঙ্গে বিএনপির কোনো জীবন্ত যোগাযোগ বা বাস্তবভিত্তিক ‘অর্গানিক এনগেজমেন্ট’ দেখা যাচ্ছে না।”
যুগপৎ আন্দোলনের কোনো কোনো নেতার দাবি, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে কিছু আসন ছাড় দিলেও শরিকদের সব আসনে নির্বাচনে জয়ী করে আনার দায়িত্ব বিএনপি পালন করেনি। উল্টো অনেক জায়গায় দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপের মুখোমুখি হতে হয়েছে শরিক দলের প্রার্থীদের।

নির্বাচনে জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর, শাহদাত হোসেন সেলিম, আন্দালিব রহমান পার্থ, ববি হাজ্জাজ ও রেজা কিবরিয়া জয়লাভ করেন। তবে যুগপৎ নেতারা বলছেন, ববি হাজ্জাজ ও রেজা কিবরিয়া কখনও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তাদেরকে বিএনপি অন্য মেকানিজম থেকে আসন ছাড় দিয়েছে। এর মধ্যে ববি হাজ্জাজ সরকারের প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন।
বিএনপির শরিক কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতা বলছেন, বিএনপির আশ্বাসে বিশ্বাস করে তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে তাদের বিশ্বাস, যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়া নেতাদের ব্যাপারেও তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন এবং যথাযথ মূল্যায়ন করবেন।
যুগপৎ আন্দোলনের তিনটি শরিক দলের নেতারা বলছেন, আন্দোলনের সময় সবাই সমান ঝুঁকি নিয়েছিলেন, কিন্তু সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সেই অংশীদারত্বের প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাদের মতে, যেখানে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ছিল জয়ী ও পরাজিত সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার হবে, সেখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সবাই-ই তো সরকারে স্থান পাননি; পরাজিতরা তো দূরের কথা। এর মধ্যে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আগেও বিএনপি শরিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। এমনকি আগামীতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে কি না, আর গঠন করা হলে সেখানে শরিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না— তা নিয়েও বিএনপি কোনো আলোচনা করেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শরিক দলের এক নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকারের যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আমরা ভেবেছিলাম আন্দোলনে থাকা দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি।’

আরেক নেতা বলেন, ‘দুই-একজনকে প্রতিমন্ত্রী করলেই জাতীয় সরকার হয়ে যায় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় শরিকদের অংশীদারত্ব থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।’
ভবিষ্যতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে যুগপৎ সঙ্গীদের মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
তবে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জাতীয় সরকার মানে সব দলকে সমানসংখ্যক মন্ত্রণালয় দেওয়া নয়; বরং সরকার পরিচালনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্পৃক্ততাই মূল বিষয়। ধাপে ধাপে সমন্বয় করে এটি আরও বাড়ানো হবে।
বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রী (নাম প্রকাশ না করে) বলেন, ‘জাতীয় সরকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুরুতেই সবকিছু সম্পন্ন হয় না। আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক আগের মতোই আছে এবং ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনায় তাদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটি আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিবেচনা করবেন। সংসদে হয়তো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে, শরিকদের ব্যাপারে আমরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করিনি। তাছাড়া, নতুন সরকারের মাত্র তিন মাস যাচ্ছে।’ – ঢাকা পোস্ট







