শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ন

ডেঙ্গু আর হামে মৃত্যু কি অপ্রতিরোধ্যই থাকবে?

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

প্রশ্ন তাই শুধু কতজন আক্রান্ত হলেন বা কতজন মারা গেলেন—এটি নয়। আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, যে রোগগুলোর ঝুঁকি সম্পর্কে আমরা জানি, যেগুলোর প্রতিরোধের উপায়ও কমবেশি আমাদের জানা, সেগুলোতে মানুষ—বিশেষ করে শিশুরা—এভাবে মারা যাবে কেন?

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হলো—মৃতদের বড় অংশই শিশু। আরও উদ্বেগের বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃত IEDCR ও WHO-সমর্থিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ টিকা নেয়নি। সরকার ইতিমধ্যে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের টিকাদানের জন্য নতুন কর্মসূচি নিয়েছে এবং ১৬ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।

হাম ও ডেঙ্গু আমাদের অপ্রতিরোধ্য শত্রু নয়; অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও প্রস্তুতির ঘাটতি। যে দেশে টিকার মাধ্যমে একটি শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব, সেখানে শিশুমৃত্যুকে নিয়তি বলা যায় না। যে রোগের বাহক মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা সম্ভব, সেখানে ডেঙ্গুকে প্রতিবছরের অবধারিত অভিশাপ হিসেবেও মেনে নেওয়া যায় না।

অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন শুধু রোগের ভয়াবহতা নিয়ে নয়; প্রশ্ন টিকাদান ব্যবস্থার নাগাল, নিয়মিত টিকাদানের ধারাবাহিকতা এবং কোথাও কোনো শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে কি না—তা নিয়ে।

অন্যদিকে ডেঙ্গুর চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজার ৯০ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৭৭। গত বছরের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৯৫৫ এবং মৃত্যু ১১০। অর্থাৎ মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যে গত বছরের একই সময়ের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু আগস্টের প্রথম ২১ দিনেই ১২ হাজার ৭৮০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন—যা এ বছরের মোট রোগীর প্রায় ৪৫ শতাংশ।

এখানেই নতুন উদ্বেগ। কারণ বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ঐতিহাসিকভাবে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বাড়ে। আগস্টের শেষভাগে এসে যখন রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, তখন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের পরিস্থিতি কী হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আরও ভয়ংকর হলো, এই দুই রোগ একই সময়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম ২১ দিনেই হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮ হাজার ৫৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৮৫ জন। একই সময়ে ডেঙ্গু রোগীও বাড়ছে। ফলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষাগার, ওষুধ ও জরুরি সেবার ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি হচ্ছে।

রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, যা গত বছর বিপুলসংখ্যক ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিয়েছিল, মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত বছর সেখানে ৬ হাজার ৪৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ফলে ডেঙ্গুর রোগী দ্রুত বাড়লে হাসপাতালের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন, এই মৃত্যু কি সত্যিই অপ্রতিরোধ্য?

হামের ক্ষেত্রে উত্তরটি স্পষ্ট—না। হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও এর বিরুদ্ধে কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত টিকা রয়েছে। একটি শিশু সময়মতো টিকা পেলে তার হাম থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। ফলে হামে শিশুমৃত্যুকে শুধুই ‘রোগের স্বাভাবিক পরিণতি’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো শিশু টিকা না পেয়ে মারা গেলে সেখানে রোগের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারও একটি প্রশ্ন থাকে।

বাংলাদেশ অতীতে টিকাদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বহু সংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই অর্জনকে ধরে রাখতে হলে নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, বস্তি, ভাসমান জনগোষ্ঠী, অভিবাসী পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের জন্য ‘মিসড চাইল্ড’ শনাক্তকরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

টিকাদানের কাজ শুধু টিকা কেন্দ্রে বসে অপেক্ষা করলে হবে না। স্বাস্থ্যকর্মীকে মানুষের কাছে যেতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, কমিউনিটি সংগঠন ও গণমাধ্যমকে যুক্ত করে পরিবারকে বোঝাতে হবে—টিকা শুধু একটি শিশুকে রক্ষা করে না; সমাজের অন্য শিশুদেরও সুরক্ষিত রাখে।

হামের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অপুষ্টি ও চিকিৎসার দেরি। হাম নিজেই গুরুতর হতে পারে, আবার অপুষ্ট শিশুদের জন্য জটিলতা আরও ভয়াবহ হতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা অন্যান্য সংক্রমণ যুক্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। তাই শুধু হাম শনাক্ত করা নয়, দ্রুত চিকিৎসা, পুষ্টি সহায়তা, পর্যাপ্ত তরল, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জটিলতা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ এর কোনো একক ওষুধ দিয়ে রোগ নির্মূল করা যায় না; প্রধান অস্ত্র হলো মশা নিয়ন্ত্রণ ও সময়মতো চিকিৎসা। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব তাই হাসপাতালের নয়—পুরো নগর ব্যবস্থার।

একটি শহরে এডিস মশার প্রজননস্থল থাকলে হাসপাতাল যতই বাড়ানো হোক, রোগের উৎস থেকে যাবে। বাসাবাড়ির ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ, ড্রেন, জমে থাকা পানি—সবকিছু নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। শুধু মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না।

এখানে দুই সিটি করপোরেশনের কাজের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। ডেঙ্গু কোনো ওয়ার্ডের সীমানা মানে না। এক এলাকার মশা অন্য এলাকায় যেতে পারে, একজন রোগী এক এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন, আরেক এলাকার বাসিন্দা অন্য এলাকায় কাজ করতে পারেন। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সমন্বিত নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে, কোথায় এডিসের ঘনত্ব বেশি, কোথায় বৃষ্টির পর পানি জমছে—এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালানো অনেক বেশি কার্যকর।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিও বদলাতে হবে। হামের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতাল তৈরি করে যদি ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকে, তাহলে সংকট এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হবে। তাই মৌসুমি রোগের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে হাসপাতালের ‘সার্জ ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত রোগী সামলানোর সক্ষমতা আগেই প্রস্তুত রাখা দরকার।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে ব্যয় বাড়ে, অথচ রোগটি প্রতিরোধ করার জায়গায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার খরচ এবং একজন গুরুতর রোগীর চিকিৎসার খরচ এক নয়। হামের ক্ষেত্রে একটি শিশুকে টিকা দেওয়ার ব্যয় এবং একটি শিশুকে আইসিইউতে চিকিৎসার ব্যয়ও তুলনাযোগ্য নয়।

তাই স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে নিতে হবে। টিকাদান, রোগ নজরদারি, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, মশা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

এখানে নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি সরানো এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। হামের ক্ষেত্রে শিশুর টিকাদান সম্পূর্ণ করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ এড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তবে নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলার সময় রাষ্ট্রের দায়িত্ব আড়াল করা যাবে না। নাগরিক সচেতনতা কখনোই দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা বা দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।

সবচেয়ে বড় কথা, রোগের সঙ্গে লড়াই করতে হলে তথ্যের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। হামের টিকা নিয়ে ভুল তথ্য, গুজব বা ভয় ছড়ানো হলে তার প্রভাব শুধু একজন শিশুর ওপর পড়ে না; পুরো সমাজের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে ডেঙ্গু নিয়ে ভুল চিকিৎসা, অপ্রমাণিত ওষুধ কিংবা দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে।

২০২৬ সালের এই দ্বৈত স্বাস্থ্যসংকট আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিচ্ছে। রোগ প্রতিরোধের সাফল্য একবার অর্জন করলেই তা চিরস্থায়ী হয় না। টিকাদানের হার সামান্য কমলে হাম ফিরে আসতে পারে। নগর ব্যবস্থাপনায় সামান্য শিথিলতা হলে ডেঙ্গু আবার বিস্তার লাভ করতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে একটি রোগের সঙ্গে আরেকটি রোগ যুক্ত হয়ে ‘ডাবল বার্ডেন’ তৈরি করতে পারে।

তাই এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সমন্বিত প্রস্তুতি। হামের জন্য প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশু শনাক্ত করা, অপুষ্টি ও জটিলতা মোকাবিলা করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গুর জন্য বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়কে সামনে রেখে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ নজরদারি, হাসপাতালের অতিরিক্ত সক্ষমতা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ ৯৩০টি হাম ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যু কিংবা ৭৭টি ডেঙ্গু মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যানের সারি মাত্র নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার আছে, একটি অসমাপ্ত শৈশব আছে, একজন মা-বাবার সারাজীবনের ক্ষত আছে।

আমরা যদি এই মৃত্যুগুলোকে ‘মৌসুমি রোগের স্বাভাবিক চিত্র’ বলে মেনে নিই, তাহলে আগামী বছরও একই সংখ্যা আমাদের সামনে ফিরে আসবে—হয়তো আরও বড় হয়ে। কিন্তু যদি প্রতিটি মৃত্যুকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখি, তাহলে পরিবর্তনের সুযোগ এখনো আছে।

হাম ও ডেঙ্গু আমাদের অপ্রতিরোধ্য শত্রু নয়; অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও প্রস্তুতির ঘাটতি। যে দেশে টিকার মাধ্যমে একটি শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব, সেখানে শিশুমৃত্যুকে নিয়তি বলা যায় না। যে রোগের বাহক মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা সম্ভব, সেখানে ডেঙ্গুকে প্রতিবছরের অবধারিত অভিশাপ হিসেবেও মেনে নেওয়া যায় না।

প্রশ্ন তাই ‘আর কতজন মারা যাবে?’—এটি নয়। এখন রাষ্ট্র, নগর কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে—‘আর একজন শিশুকেও যেন এই কারণে মরতে না হয়, তার জন্য আমরা আজ কী করছি?’ সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ রোগের কাছে পরাজিত হবে, নাকি জনস্বাস্থ্যের শক্তিতে জয়ী হবে।


এই বিভাগের আরো খবর