অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ছৈয়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা জোবাইরুল হক জিয়ান (৩১) উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক শিক্ষা ও পাঠচক্রবিষয়ক সম্পাদক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে ফাঁদ পাতেন। পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপন ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছেন।
‘হানিট্র্যাপ’-এ সাবেক সিএমপি কমিশনার

তদন্তে হাসিব আজিজের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর ও চারটি ভিডিও পাওয়া গেছে। এর একটিতে দেখা যায়, সানজিদা ইসলাম সায়মার ফেসবুক লাইভ থেকে ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে এনে ভিডিও কলে চালানো হয়েছিল। এতে বোঝা যায় অপর প্রান্তে প্রকৃত সানজিদা ছিলেন না। ২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই ভার্চুয়াল যোগাযোগের চারটি ভিডিওর একটিতে সাবেক কমিশনারকে আপত্তিকর অবস্থায় এবং বাকি তিনটিতে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।
হাসিব আজিজ চারটি ভিডিওর মধ্যে তিনটি নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। ‘হানিট্র্যাপে’ পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে ঢাকা পোস্টকে তিনি জানান, পরিচয়টি ভুয়া জানার পরই তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেন। তবে ওই চক্র তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, হাসিব আজিজের ব্যক্তিগত ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সিএমপির বিভিন্ন থানার পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব ফেলতেন ছাত্রলীগের জিয়ান ও দুই ওসি—বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলাম। পদায়ন ও বদলির দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানকে দিয়ে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে ফোন করানো হতো এবং কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায় করা হতো। মূলত কোন থানায় কাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা কাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এসব প্রশাসনিক বিষয়ে পুরো প্রভাব বিস্তার করত এই চক্র। সিএমপির তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টি জেনেও গোপন ভিডিও প্রকাশের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

সূত্র জানিয়েছে, হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে এপিবিএনে যোগ দিলে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করে। সেই অনুসন্ধানে জিয়ানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ, গোপন ভিডিও ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তে জানা যায়, জাহেদুল ইসলামকে কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করার বিষয়টি আগেই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় জানানো হয়েছিল। পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর জিয়ান ও জাহেদুলের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওসি জাহেদুল জিয়ানকে একটি আইফোন উপহার দেন এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান। জিয়ানের ফেসবুক প্রোফাইলে ওসির গাড়িতে চড়ে কর্ণফুলী টানেল পার হওয়ার ছবি পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এরকম তো অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। কে, কখন, কোথায় তা ব্যবহার করেছে বা আমার সঙ্গে ছিল কি না, আমি আসলে জানি না।’
আর পাহাড়তলী থানার সাবেক ওসি ও বর্তমান সিএমপির ডিবি কর্মকর্তা বাবুল আজাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমার বিষয়ে অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে ভালো করে নিউজ করেন। তার (জিয়ান) সাথে আমার সখ্যতা থাকার বিষয়টা আপনারা প্রমাণ করেন। আর এটা নিয়ে যে মেয়েটা ভুক্তভোগী তার সাথে কথা বলেন। তাহলেই সত্য-মিথ্যা সব প্রমাণ হয়ে যাবে।
এদিকে, বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সাবেক পুলিশ কমিশনারও এ ধরনের কোনো অভিযোগ লিখিত বা মৌখিকভাবে জানাননি। আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে দিন, আমি ব্যবস্থা নেব।’
ফাঁদে ফেলতে ৫৪ অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক, জিয়ানের পক্ষে ফোন প্রতিমন্ত্রীর!
ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের প্রতারণার পরিধি কেবল একটি বা দুটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ ছিল না; তদন্তে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৪টি নারী পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। জিয়ান ‘জান্নাতুল মনি’ নামের একটি পরিচয়কে নিজের বোন হিসেবে এবং ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই ভুয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জিয়ান এমনকি বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, ডজনখানেক রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছেন।

চট্টগ্রাম পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, সম্প্রতি জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে সোর্স নিয়োগ করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। তার বসতবাড়িতে নজরদারিও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পেরে জেলা পুলিশকে থামাতে বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করান জিয়ান।
সরকারি যে সংস্থা বিষয়টি তদন্ত করছে তারা সাবেক সিএমপি কমিশনারের হানিট্র্যাপে পড়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিলেও অন্যদের বিষয়ে কী কী জানা গেছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে অন্য রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নাম-পরিচয় জানতে পারেনি ঢাকা পোস্ট।
এদিকে, বর্তমান সরকারের কোন প্রতিমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের জন্য সম্প্রতি সুপারিশ করেছেন তা নিয়েও মুখ খুলছে না চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তাই বিষয়টি এখনো গোপন রয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা আলোচনা চলছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
আগে ট্র্যাপে ফেলতেন আওয়ামী নেতাদের
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোবাইরুল হক জিয়ানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২০ সালের ২৯ মে সাতকানিয়া থানা-পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। তখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেখানে ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখিয়ে অর্থ দাবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে নারীকণ্ঠে কথা বলে ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতকানিয়ায় পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের সময় আবারও গ্রেপ্তার হন জিয়ান। সে সময়ও ভুয়া নারী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার নাম করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিশ্চিত করেছিল পুলিশ।
বারবার গ্রেপ্তারের পরও তার অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার যোগাযোগের জাল রাজনৈতিক অঙ্গন পেরিয়ে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
সাতকানিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাসেল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতারক জিয়ানের নানা অপকর্মের তথ্য পুলিশের কাছে প্রেরণ করা ও প্রতিবাদ করায় আমাকে ওসি বাবুল আজাদের নির্দেশে এসআই মনিরুলসহ একটি দল নগরের রাইফেল ক্লাব এলাকা থেকে আটক করে। পরে আমাকে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমি আড়াই মাস জেলে ছিলাম।
জিডি করেছেন আসল মডেল সায়মা
এদিকে নিজের নাম ও ছবি ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন প্রকৃত মডেল সানজিদা সায়মা।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার নাম ব্যবহার করে ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গে নানা অপকর্ম করেছে বলে জানতে পারি। এ ঘটনায় আমি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। যদিও পুলিশ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আমাকে আর কোনো আপডেট দেয়নি। এভাবে আমার মানহানির জন্য দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
কী বলছেন অভিযুক্ত জিয়ান
অভিযুক্ত জোবাইরুল হক জিয়ান সব অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটি আমাদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়। বিষয়টি নিয়ে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। যে দুই ওসির কথা বলা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সিএমপি কমিশনারের মতো মানুষের কাছে আমি কিছুই না। তিনি চাইলেই তো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তিনি নিলেন না কেন?’







