বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীর ‘জীবিত মাছ’ যাচ্ছে দেশের ২৮ জেলায়, প্রতিদিন বিক্রি ২০ কোটি টাকার

নিউজ ডেস্ক :
আপডেট : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

রাজশাহী বিভাগে রুই-কাতলসহ কার্পজাতীয় মাছ চাষে যেন বিপ্লব ঘটেছে। বিভাগের আট জেলায় বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন মাছ। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছ যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতিদিন বিকাল থেকে ভোর পর্যন্ত শত শত ট্রাকে যাচ্ছে এসব তাজা মাছ। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি হচ্ছে এই অঞ্চল থেকে।

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মোট পুকুর রয়েছে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি। এসব পুকুরে মাছ চাষ করছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৬ জন চাষি। বছরে মাছ উৎপাদন হচ্ছে ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৭ মেট্রিক টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। মাছ চাষ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি এখানকার কিছু মাছ বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ২৪ বছর আগে রাজশাহী অঞ্চল থেকে তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ অন্তত ২৫টি জেলায় প্রতিদিন তাজা মাছ পাঠানো হচ্ছে। জীবিত অবস্থায় মাছ পরিবহন ও সরবরাহের কারণে রাজশাহীর মাছের চাহিদাও বাড়ছে।

মাছ 02

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিকাল থেকে ভোররাতের মধ্যে ৫০০টির বেশি ট্রাকে করে তাজা মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। প্রতিটি ট্রাকে থাকে কমপক্ষে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাছ। এই হিসাবে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার বেশি মাছ বিক্রি হচ্ছে।

দুই বিঘা পুকুর থেকে হাজার বিঘায়

দুর্গাপুর উপজেলার গোলাম সাকলাইন মাছ চাষে সফলতার অন্যতম উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে অনার্স পড়ার সময় নিজ এলাকায় মাত্র দুই বিঘা জমির পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। পুঁজি ছিল মাত্র ৭ হাজার টাকা। প্রথমবারেই লাভ করেন ৬ হাজার টাকা। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

বর্তমানে প্রায় এক হাজার বিঘা জমির পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন গোলাম সাকলাইন। তার মাছের খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫২ জনের।

গোলাম সাকলাইন বলেন, ‘কৃষির সঙ্গে মাছ চাষকে আমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। মাছ চাষ করবো বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তখন পরিবারের সদস্যরা কেউ এই পেশায় আসতে দিতে চাননি। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মাছ চাষ করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, বর্তমানে তার পুকুরের আয়তন প্রায় ১ হাজার বিঘা। প্রতিদিন তার খামার থেকে প্রায় ২০টি ট্রাকে মাছ রাজধানী ঢাকায় যায়।

নাটোর-নওগাঁয়ও জমজমাট বেচাকেনা

মিঠাপানির কার্পজাতীয় মাছ উৎপাদনে দেশের মধ্যে রাজশাহী বিভাগ অন্যতম শীর্ষ অঞ্চল। বিভাগের মধ্যে নাটোর ও নওগাঁয় মাছের উৎপাদন ও বেচাকেনা বেশি। এসব অঞ্চলের পুকুরে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্পের পাশাপাশি পাবদা, ট্যাংরা, শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে।

পুকুর থেকে মাছ তুলে বিশেষ ব্যবস্থায় জীবিত অবস্থায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে মাছের গুণগত মান ও বাজারমূল্য দুটিই ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বাড়ছে খরচ, কমছে লাভ

তবে মাছ উৎপাদন বাড়লেও চাষিদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খাদ্যের দাম বাড়লেও সে তুলনায় মাছের দাম না বাড়ায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পরিবহন খরচও বাড়ছে।

দুর্গাপুর উপজেলার মাছচাষি ইদ্রিস আলী বলেন, তাঁর উপজেলা থেকে প্রতিদিন ৫০টির বেশি ট্রাকে মাছ ঢাকায় যায়। তবে বর্তমানে মাছের দাম কিছুটা কমেছে। খাদ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, মাছের দাম সেভাবে বাড়েনি। ফলে লাভ কম হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকায় মাছ পাঠাতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া দিতে হচ্ছে। মৎস্য অধিদফতর থেকে আর্থিক সহযোগিতা না পেলেও বিভিন্ন পরামর্শ ও সেমিনারের মাধ্যমে তাঁরা উপকৃত হচ্ছেন।

পারিলা থেকে প্রতিদিন ৫০ ট্রাক মাছ

রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয় পবা উপজেলায়। পারিলা ইউনিয়নে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারি সারি পুকুর। কোথাও পুকুর থেকে মাছ ধরা হচ্ছে, আবার কিছু দূরেই সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পানিভর্তি ছোট-বড় ট্রাকে তোলা হচ্ছে সেই মাছ।

পারিলা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫০ ট্রাক তাজা মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে যায়। পুরো রাজশাহী জেলা থেকে প্রতিদিন ২০০টির বেশি ট্রাকে মাছ পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

পারিলা গ্রামের মোশারফ হোসেন প্রায় ১৪ বছর ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ পাঠাচ্ছেন। তার প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর পুকুর রয়েছে।

Rajshahi Fish News 12.07 (2)পুকুর থেকে ধরা হচ্ছে মাছ

মোশারফ হোসেন বলেন, ‘একসময় রাজশাহীতেই মাছ বিক্রি করতে হতো। দাম তেমন পাওয়া যেত না। পরে ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ নেওয়া শুরু করি। তখন ট্রাকে এক-দুজন লোক রাখতে হতো। তারা সারা রাস্তা পানিতে পা দোলাতেন।’

বর্তমানে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে ট্রাকে পানি সরবরাহ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এতে মাছগুলো সারা পথ পানির মধ্যে থাকে এবং পুকুরের মতো পরিবেশে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এতে মাছ ভালো থাকে এবং দামও ভালো পাওয়া যায়।

মোশারফ হোসেন জানান, সেদিন তিনি এক ট্রাকে ১ হাজার ২০০ কেজি মাছ ঢাকার নিউ মার্কেটে নিয়ে যান। ওই মাছ বিক্রি করেন ৩ লাখ টাকায়।

দেশি মাছেও তৈরি হয়েছে বড় বাজার

রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, আগে শুধু রাজশাহী অঞ্চলে মিশ্র পদ্ধতিতে মাছ চাষ হতো। এখন বিভাগের অন্য জেলাগুলোতেও এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ হচ্ছে।

তিনি বলেন, পুকুরে প্রধান মাছ হিসেবে রুই চাষের পাশাপাশি সিলভার কার্প, কাতলা এবং দেশি ছোট মাছও চাষ করা হচ্ছে। এতে পুকুরের ভারসাম্যও বজায় থাকে। বড় মাছের পাশাপাশি পাবদা, শিং, কই ও মাগুরের উৎপাদনও হচ্ছে। এসব মাছ রাজশাহীর বাইরে বড় একটি বাজার তৈরি করেছে।

সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বলেন, ‘পাবদা মাছ নিয়মিতভাবে ভারতেও রফতানি হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, রাজশাহীর চাষিরা নিয়ম মেনে মাছ চাষ করছেন। মৎস্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বছরে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে মাছ চাষবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষকের মাছ প্রদর্শনের মতো বিভিন্ন কর্মসূচিও নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ফসলের পাশাপাশি মাছ চাষ এখন রাজশাহী বিভাগের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। উৎপাদন থেকে পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও খুচরা বিক্রি পুরো প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান। আর প্রতিদিন শত শত ট্রাকে করে রাজশাহীর পুকুরের মাছ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।  বাংলা ট্রিবিউন


এই বিভাগের আরো খবর