রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আক্রান্ত এক শিশু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যের একটি কমিটি কঠন করেছে। কমিটি সদস্যরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে কাজও শুরু করেছেন। প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছে রোগীরা। রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে ডাক্তার ও নার্সরা। এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিদর্শন শেষে বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডাক্তার রফিকুল ইসলাম জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

রাজশাহী অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনটি শিশু ওয়ার্ডে ১২০টি বেডের বিপরীতে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছে প্রায় ৮০০ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে রাজশাহীতে পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা এবং রোগ নির্ণয় না হওয়ায় শিশু ওয়ার্ডে অন্য শিশুরোগীদের সাথে রাখা হয়েছে। শুধু রাজশাহী না, আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে শিশুদের সংক্রামক রোগ ‘হাম’। রাজশাহী বিভাগের সাতটি সদর হাসপাতাল এবং চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৪৬ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষা করে ৭৭ জনের হাম পজিটিভ পেয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮ জন শিশু। বর্তমানে তাদের ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের আইসোলেশন কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এসব রোগীদের মধ্যে অনেকেই অন্য রোগ নিয়ে এসে হামে আক্রান্ত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। বেড ছাড়াও মেঝে ও বারান্দায় রোগীর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এদের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়েও আসছে অনেকেই। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো হাসপাতালে অন্য রোগে চিকিৎসা নিতে এসে বহু শিশু সংক্রামক রোগ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক রোগীর অভিভাবক জানিয়েছেন হাসপাতালে এসে হামে আক্রান্ত হয়েছে তাদের সন্তান।
নওগাঁ থেকে আসা সাগর হোসেন জানান, শয্যা না পেয়ে তিনি তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, “বারান্দায় ঠিকমতো চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না, তার ওপর বৃষ্টির ভয় তো আছেই। টাকার অভাবে বেসরকারি হাসপাতালেও যেতে পারছি না।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা শিউলি বেগম জানান, শয্যা না পেয়ে মেঝেতে এক জায়গায় ২-৩ জন শিশুকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। কুষ্টিয়ার আসাদুল্লাহ অভিযোগ করেন, “জ্বর নিয়ে এসেছিলাম, এখন দেখছি বাচ্চার শরীরে হামের লক্ষণ। সব রোগীকে এক জায়গায় রাখায় সুস্থ বাচ্চা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। প্রতিটি রোগের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা জরুরি।” সুচিকিৎসার অভাব রয়েছে বলে অনেক রোগীর অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন জানান, বর্তমানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২৮০ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত ‘হাম কর্নার’ এবং সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
ডা. শাহিদা আরও জানান, “আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশেরই বয়স ৬ মাসের নিচে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণত ৯ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়, কিন্তু তার আগেই বিপুল সংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আটটি জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ১৩৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের সুরক্ষায় সময়মতো টিকা প্রদান এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাসুদ উল আলম জানান, বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগী আসার সংখ্যা বেড়েছে। সীমিত আইসিইউ সুবিধা ও জনবল নিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোমবার দুপুরে রামেক হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।” ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ কেন বাড়ছে, তা খুঁজে বের করতে জরুরি গবেষণার দাবি জানান তিনি।
পরিতোষ চৌধুরী আদিত্য
রাজশাহী ৩০ মার্চ ২০২৬