বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ন

শিশুর নিউমোনিয়া চিকিৎসায় ডে-কেয়ার কার্যকর

নিউজ ডেস্ক
আপডেট : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

শিশু জন্মের পর অনেক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে নিউমোনিয়া একটি কঠিন রোগ। তবে ঠিকমতো চিকিৎসায় এ রোগ থেকে শিশুদের সুস্থ করে তোলা যায়।

শিশুদের তীব্র নিউমোনিয়া হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাই নিয়ম। তবে, বেশিরভাগ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে সাধারণত তীব্র নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত সব শিশুর চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক হাসপাতাল ও শয্যা থাকে না। এছাড়া মায়েরাও সাংসারিক কাজের চাপে হাসপাতালে শিশুকে ভর্তি করে সময় দিতে পারেন না।

গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালের চেয়ে দিবাযত্ন (ডে কেয়ার) ব্যবস্থাপনায় নিউমোনিয়া চিকিৎসা অধিক কার্যকর। এ ব্যবস্থাপনায় খরচও অনেক কম। তাদের মতে, দিবাযত্ন ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে পারলে দেশে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যু কমবে। এ ধরনের শিশুর জন্য ‘ডে কেয়ার মডেল’-এর মতো বিকল্প ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কার্যকর।

ডে কেয়ার ব্যবস্থাপনায় শিশুকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন কম হয় ও ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসে। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্যাসেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকির সহযোগিতায় আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদারময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায়  এ তথ্য উঠে এসেছে। তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তিন হাজার ৪৯ শিশু নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে। ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট ও গবেষণাটির প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ড. নুর হক আলম বলেন, তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েরা হাসপাতালে যেতে চান না।

হাসপাতাল দূরে, শয্যাসংকট, পরিবারের কাজের চাপ, যাতায়াত সমস্যা, খরচ-এসব বিবেচনায় নিয়ে শিশুকে হাসপাতালে নিতে চান না। কিন্তু বাড়ির কাছে সেবা নিতে তাদের কোনো দ্বিধা থাকে না।

গবেষকরা গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং শহরে এনজিও ও ব্যক্তিগত ক্লিনিকে দিবা যত্নের ব্যবস্থা করেছিলেন। ধামরাই, করিমগঞ্জ, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ সদর এলাকায় এ গবেষণা করা হয়। এসব এলাকার চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও শয্যার ব্যবস্থা করা হয়। সেগুলো সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখা হতো। দেখা গেছে গ্রামের ৯৩ ও শহরের ৮৪ শতাংশ শিশু নিরাপদ চিকিৎসা পায়। হাসপাতালে চিকিৎসায় যে খরচ হয়, এখানে খরচ হয় তার অর্ধেক।

আইসিসিডিআরবি’র পুষ্টি ও ক্লিনিক্যাল সেবা বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ বলেন, প্রতি বছর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ এবং বিশ্বে হাজার হাজার শিশু মারা যায়। কমিউনিটিতে রেখে, বিকল্প ব্যবস্থা করে আইসিসিডিআরবির বিজ্ঞানীরা সাশ্রয়ী একটি পন্থা উদ্ভাবন করেছেন। এ উদ্ভাবন বাংলাদেশসহ বিশ্বেও বিভিন্ন দেশে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যু কমাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে।

এ মডেলটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করে অক্সিজেন থেরাপি, ফ্লুইড, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও অ্যান্টিবায়োটিকের সমন্বয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মতই কার্যকর, নিরাপদ এবং বেশ ব্যয় সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দিবাযত্ন ধারণা ভিত্তিক নিউমোনিয়া ব্যবস্থাপনার এ পদ্ধতি বেশ সম্ভাবনাময়।

পরিসংখ্যান মতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫ বছরের কম বয়সি শিশুরা প্রায় ১২ কোটি বার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। যার প্রায় ১০ শতাংশের বেশি (১ দশমিক ৪ কোটি) তীব্র আকার ধারণ করে এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়।

উন্নয়নশীল দেশসমুহে শ্বাসতন্ত্রের নিম্নাংশের তীব্র সংক্রমণ (এএলআরআই) বিশেষ করে নিউমোনিয়া ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ, যা বছরে ৫০ লাখ মৃত্যু বা প্রতি ৫টি মৃত্যুর একটি। বাংলাদেশে ২০১৮ সালে প্রতি ঘণ্টায় একজনেরও বেশি শিশু নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। অর্থাৎ এক বছরে ১২ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কড অধ্যাপক ড. হামিদা আক্তার এ সংক্রান্ত  অন্যান্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল উপস্থাপন কালে বলেন, দেখা গেছে অপুষ্টিসহ বা ছাড়া তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৯০ শতাংশ শিশুর চিকিৎসা ডে কেয়ার ক্লিনিকে নিরাপদভাবে করা যায়।

অবশ্য সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। যে কারণে দেশে শিশু মৃত্যুর হার এখন অনেকটাই কমেছে। এক দশক আগে যেখানে গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়াটা কল্পনা করা যেত না; এখন বলতে গেলে প্রতিটি ইউনিয়নেই স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে গেছে।

ডে কেয়ার ক্লিনিকি সম্পর্কে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শায়লা হক বলেন, ‘নিউমোনিয়া থেকে রক্ষা পেতে দিবাযত্ন পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে তার আগে এ রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে আগে শিশুর মায়েদের সচেতন করে তোলা দরকার। কেবল সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়, সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে।’


এই বিভাগের আরো খবর