সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯ বহাল ও কমিশন বৃদ্ধির দাবীতে মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মরকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলা ইউনিট। রোববার দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী কোর্ট চত্ত্বরে মানববন্ধন শেষ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের মহিনুল হাসানের কাছে এই মানববন্ধ দেয়া হয়। মানববন্ধন ও স্মারকলিপি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলা ইউনিটের সভাপতি ওসমান আলী, সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম ও সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা বলেন আমরা ৩০/৩৫ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছি এবং আমরা পরীক্ষিত ডিলার। ২০০৯ এর নীতিমালা বাতিল করার হলে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার ইউনিয়ন পর্যায়ে খুচরা ডিলারদের পেটে লাথি মারা হবে। ২০২৫ সালের খসড়া নীতিমালায় আছে একটি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার থাকবে এবং প্রতিটা ডিলারের অধিনে ৩টা করে গোডাউন থাকবে। বাস্তবতা হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে একজন ডিলারই যে যত সামান্য সার পায় তা দিয়ে একটা দোকান চালানো সম্ভব হয়। এরপরেও একজন ব্যবসায়ীকে তিনটি দোকান করতে হয় তাহলে দোকানের ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও ব্যাংক ইন্টারেস্ট দিয়ে তাদের পোষাবে না। এই সার নিয়ে আরো হৈচৈ সৃষ্টি হবে। তাই ২০০৯ সালের নীতিমালার বাস্তবায়ন চায় সার ডিলাররা।

স্মারকলিপিতে এসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ¦ ওছমান আলী বলেন, ৩০-০৯-২০২৫ ইং তারিখ মিডিয়ার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা ২০২৫ নামে একটি নীতি মালা কৃষি মন্ত্রণারয় কর্তৃক একতরফাভাবে খসড়া অনুমোদন দিয়েছে, যা আগামী জানুয়ারী-২০২৬ সালে কার্যকর করা হবে। সমগ্র বাংলাদেশের সার ডিলারদেরসংগঠন বিএফএ’র পক্ষ থেকে এই নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুমোদনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তারা। সেই সাথে ২০২৯ সালের নীতিমালা বহাল রাখারও দাবী জানান।
মানববন্ধনে তিনি আরো বলেন, রাজশাহী জেলায় মোট ইউনিয়ন ও পৌরসভা ৮৬টি এবং জেলায় বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছে ৮৯ জন এবং বিএডিসি ডিলার ১৩১ জন। সার ডিলার নিয়োগ ও সমন্বিত নীতিমালা ২০০৯ মোতাবেক প্রতিটি ইউনিয়নে ১ জন সার ডিলার নিয়োগ এর বিষয়ে বলা হয়েছে। বর্তমানে নিয়োজিত বিসিআইসি ডিলারগণ তার ব্যবসায়িক ইউনিয়নে বিগত ৩০ বৎসর যাবৎ সুনামের সহিত কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। বিদ্যমান সার ডিলারগণ সরকারের সুষ্ঠু সার ব্যবস্থাপনায় এবং জাতীয় খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ জন পূর্বের নিয়োগকৃত বিসিআইসি সার ডিলারগণকে বহাল রাখার দাবি জানান জানানো হয়।
তিনি আরো উল্লেখ করেন ১৯৯৬ সাল হইতে বর্তমান পর্যন্ত সার বিক্রয়ে কমিশন বৃদ্ধি করা হয় নাই। ডিলার প্রথা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১০০ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। বর্তমানে জ্বালানী তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া গোডাউন ভাড়া, কর্মচারী বেতন, লোড-আনলোড খরচ, ব্যাংক সুদসহ আনুসাংগিক যাবতীয় খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পরও বিক্রয় কমিশন বৃদ্ধি করা হয় নাই। তারা ১০০/- টাকার পরিবর্তে ৩০০/- টাকা বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।
আরো উল্লেখ করা হয় বিসিআইসি ডিলারগণ সব সময় সরকার নির্ধারিত বিক্রয় মূল্যে সার বিক্রয় করে থাকেন। যে সার তারা উত্তোলন সেই সার সঠিক সময়ে বিক্রি হয়না। কিন্তু তাদের সরকারের নিয়মানুযায়ী সার উত্তোলন করতে হয়ে। নতুন নীতিমালায় এখন আবার একজন ডিলারকে ৩টি গোডাউন রাখতে হবে। এ ব্যবস্থা চালু হলে সার ডিলারগণ মারাত্বক ক্ষতির সম্মুখিন হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মানবন্ধন শেষে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান( অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব) এর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।

স্মারকলিপিতে তরা উল্লেখ করেন খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়ন করার আগে বিদ্যমান স্টেক হোল্ডার তথা সার বিপণন নিয়োজিত ডিলারদের মতামত নেয়া হয়নি বা এ সংক্রান্ত সভায় তাদেরকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অপরদিকে ডিলারদের ট্রাকযোগে সার পরিবহনের পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব/সিদ্ধান্ত ফাইল বন্দি। অসাধু ব্যবসায়ীদের শান্তি দেয়া হোক এতে তাদের আপত্তি নাই। আসন্ন ইরি-বোরো ধান উৎপাদনের পিক মৌসুম এ ক্রান্তিলগ্নে নতুন সার ডিলার নিয়োগের লক্ষ্যে প্রণয়নকৃত খসড়া নীতিমালার কার্যক্রমে অহেতুক বিদ্যমান সার ডিলারদের হয়রানি না করার জন্য জেলা প্রশাসক ও সভাপতি, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির নিকট সকল সার ডিলারদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন যেমন ব্যাহত হবে। এতে সার্বিকভাবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারাও প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। চলতি ইরি-বোরো ভরা মৌসুমে কৃষকের দোরগোড়ায় সময়মত সার পৌঁছাতে না পারলে দেশ কাঙ্খিত খাদ্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়ে দেশে খাদ্য ঘাটতি পরিলক্ষিত হবে বলে উল্লেখ করেন তারা।
নতুন নীতিমালাতে একটি ইউনিয়নের ৩জন ডিলার নিয়োগ প্রস্তাব এবং প্রত্যেক ডিলারের ৩টি সেলস সেন্টার ও গুদাম থাকতে হবে যাতে পরিচালন ব্যয় ২০০৯ নীতিমালা থেকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে, প্রকারান্তরে সার বিপণনে অস্থির/অরাজকতা তৈরী হবে। বিনিয়োগ অনুযায়ী ডিলারের লোকসান বৃদ্ধিতে ডিলার ক্ষতিগ্রন্থ হবে। এমনিতেই বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে ডিলারগণ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। যেহেতু সার ডিলারগণ সরকার নির্দেশিত বিসিআইসি’র কারখানা থেকে সার নগদ মূল্যে ক্রয় করে কৃষকের নিকট বাকীতে বিক্রয় করে বকেয়া টাকা ফেরত পাচ্ছে না। ব্যাংক ও কিস্তিকৃত ঋনের টাকা পরিশোধ করতে অনেক ডিলারের ভিটেবাড়ী বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিলারের পরিচালন ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে কমিশন বৃদ্ধি পেলে ডিলার বাঁচবে আর ডিলার বাঁচলে কৃষি ও কৃষক বাঁচবে জানান তারা। ২০২৫ সালের সার ও ডিলার নিয়োগ নীতিমালার বাস্তবায়ন স্থগিত করে ২০০৯ সালের পরীক্ষিত বিদ্যমান নীতিমালা বহাল এবং বাস্তবতার নিরীখে কমিশন বৃদ্ধির পদক্ষেপ তুরান্বিত করার দাবী জানান তারা।