জেলা ১৬টি। আসন ১৫২টি। বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ। সমগ্র উত্তরবঙ্গ এবং গোটা জঙ্গলমহলের পাশাপাশি ভোট হবে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলায়। রাজ্যের অর্ধেকের বেশি আসনে এই ভোটে মূল যুযুধান দু’পক্ষ তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়েই চাইবে যথাসম্ভব ‘দাপট’ দেখিয়ে রাখতে। টি২০ ক্রিকেটের পরিভাষায় ‘পাওয়ার প্লে’-তে যথাসম্ভব রান তুলে রাখতে।

প্রথম দফার ভোটের ১৫২টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৯২টিতে। বিজেপির দখলে ছিল ৫৯টি আসন। পাহাড়ের একটি আসন পেয়েছিল নির্দল। কিন্তু লোকসভা ভোটের বিধানসভা ভিত্তিক ফলাফলে বিস্তর বদল ঘটে গিয়েছে। ৯২ থেকে কমে তৃণমূলের এগিয়ে থাকা বিধানসভার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে। বিজেপি-ও ৫৯ থেকে সামান্য কমেছে। তারা এগিয়েছিল ৫৩টি আসনে। ২০২১ সালে যে বাম-কংগ্রেস ছিল শূন্য, তারা আবার গত লোকসভা ভোটে ১২টি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল। এর মধ্যে কংগ্রেস ১১টি এবং বামেরা একটিতে। ঘটনাচক্রে, বাম-কংগ্রেসের এগিয়ে থাকা বিধানসভাগুলি তিনটি জেলায় সীমাবদ্ধ— মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুর। এই তিন জেলাতেই গত বিধানসভা ভোটে সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছিল তৃণমূল। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল তৈরি করার পরে এই তিন জেলায় এমন সাফল্য কখনও পায়নি জোড়াফুল শিবির। প্রসঙ্গত, এই তিন জেলার ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘু ভোট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ বার নানা সমীকরণ তৈরি হয়েছে ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে। যেখানে বৃহস্পতিবার ভোট।
সংখ্যালঘু ভোট
মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরে মোট ৪৩টি আসন রয়েছে। প্রায় সব আসনেই সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই তিন জেলাতেই সংখ্যালঘু ভোট ভাগের বিভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে হুমায়ুন কবীর নিজের দল গড়ে প্রার্থী দিয়েছেন। যদিও হুমায়ুন যে ভাবে শুরু করেছিলেন, ভোট যত এগিয়েছে তত তাঁর দলের ছন্নছাড়া অবস্থা প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় হুমায়ুনের দলের প্রার্থীরাই তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। গোপন ক্যামেরা অভিযানে হুমায়ুনের সঙ্গে বিজেপি-যোগের ফুটেজ প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাপরম্পরা বলছে, ওই গোপন ক্যামেরা অভিযান প্রকাশ্যে আসার পর থেকে গত ১৫ দিনে হুমায়ুনের দলের করুণ দশা বেআব্রু হয়ে গিয়েছে। যা তৃণমূলের জন্য খানিকটা স্বস্তির বলেই অভিমত অনেকের। তবে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই তিন জেলাতেই বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ ময়দানে রয়েছে। অন্তত ১৭টি আসনে বাম-কংগ্রেসের প্রচার এবং জমায়েত সাড়া ফেলেছে। ভোটবাক্সে তার কতটা প্রতিফলন হবে বা আদৌ হবে কি না, তা বোঝা যাবে ফলপ্রকাশের পরে। তবে কোচবিহার এবং জলপাইগুড়ির যে আসনগুলিতে সংখ্যালঘু ভোট উল্লেখযোগ্য, সেখানে তৃণমূলের সমান্তরাল কোনও শক্তি মাথা তুলতে পারেনি।
হিন্দু ভোটের মেরুকরণ
মালদহ, মুর্শিদাবাদ, দুই মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান এবং কোচবিহারে মেরুকরণের আবহ তীব্র থাকায় সেখানে হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ। প্রত্যাশিত ভাবে তা বিজেপির দিকেই গিয়েছে গত কয়েকটি ভোটে। এ বারও তার অন্যথা হওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি অন্তত প্রচারপর্বে দেখা যায়নি। বরং মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন অংশে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে সেই মেরুকরণের আবহ আরও তীব্র হয়েছে। এক দিকে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার নানা সমীকরণ এবং অন্য দিকে হিন্দু ভোটের ‘ঐক্য’ তৃণমূলের জন্য খুব শুভ সঙ্কেত নয় বলেই অনেকে মনে করছেন। যদিও অতীতে দেখা গিয়েছে, উল্টো দিকে বিজেপির উপস্থিতির কারণে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

![]()
রাজবংশী ভোট
২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালে যে পরিমাণ রাজবংশী ভোট জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহারে বিজেপির পক্ষে ছিল, তাতে কিছুটা ক্ষয় হয়েছিল গত লোকসভা নির্বাচনে। বিজেপির সমর্থনে রাজ্যসভায় যাওয়া অনন্ত মহারাজের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতার নৈকট্য নিয়েও বিস্তর জল্পনা রয়েছে। রাজবংশী ভোট ভাঙার জন্যও তৃণমূল কৌশলের ত্রুটি রাখেনি। আবার বিজেপি-ও ক্ষয় মেরামত করতে নানা সাংগঠনিক পদক্ষেপ করেছে।
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়িতেও উল্লেখযোগ্য ভাবে তফসিলি এবং আদিবাসী ভোট রয়েছে। সেই ভোটে বিজেপির যে আধিপত্য তৈরি হয়েছিল ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে, গত বিধানসভা এবং গত লোকসভা নির্বাচনে তার অনেকটাই ভাঙতে পেরেছিল তৃণমূল। যদিও গত কয়েক মাসে তফসিলি ও আদিবাসী ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি প্রচারে খামতি রাখেনি। বিশেষত, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অপমান’ বিতর্ককে ‘হাতিয়ার’ করে পশ্চিমাঞ্চলেই তৃণমূল তথা রাজ্য সরকার-বিরোধী প্রচারকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে পদ্মশিবির।

হিসাবের বাইরে এসআইআর
এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রথম দফায় ভোটমুখী ১৬টি জেলায় সাড়ে ৪০ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরেই শুধু বাদ পড়েছে প্রায় ১৬ লক্ষ নাম। কার্যত সব পক্ষের কাছেই নতুন ভোটার তালিকা। ফলে অতীতের হিসাব যে সব ক্ষেত্রে একই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বাদের সংখ্যা তুলে ধরে বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম তাদের মতো করে রাজনৈতিক আখ্যান তুলে ধরেছে প্রচারে। কেউ বলেছে, বেনোজল বার করে দেওয়া হয়েছে। ‘ভূতহীন’ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ভোট হবে। আবার কেউ বলেছে, রাষ্ট্রীয় লুটের পরে ভোট হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। যে ভোটের বাইরে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক। বিজেপি-বিরোধীরা এই ভাষ্যও তুলে ধরছেন যে, ‘এ বার ভোট তাঁদের জন্য, যাঁদের এ বার ভোট নেই!’ তবে এ সবই রাজনৈতিক ধারণা নির্মাণের জন্য। নাম বাদ পড়া ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব তৈরি করবে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নেরই জবাব দিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বুথের লাইনে দাঁড়াবেন ১৫২ আসনের ভোটারেরা।