বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪০ অপরাহ্ন

‘আলোর উঠান’পাঠাগারের সেরা বই পড়ুয়াকে পুরস্কারের পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

রাজশাহীর পবা উপজেলা পরিষদ চত্বরে ঢুকলেই পুকুরপাড়। সেই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আলোর উঠান পাঠাগারটি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যাওয়ার আগেই চোখে পড়বে এই পাঠাগার। একটি বেদিতে দেয়াল তুলে করা হয়েছে বই রাখার স্থান।পুকুর পাড়ে বসে গাছের সুশীতল ছায়ায় মনোরম পরিবেশে বসে যে কেউ ডুব দিতে পারবেন বইয়ের রাজ্যে।পাঠাগারের কাঁচের পাল্লা টেনে যে কেউ সেখানে বই নিয়ে পড়তে পারবেন। বই পড়া শেষে আবার সযত্নে রেখে দিতে হবে। নিবন্ধিত পাঠকেরা এই বই বাড়িও নিতে পারবেন পড়ার জন্য।
উদ্বোধনের পরই পাঠক টানছে এই পাঠাগার। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে পাঠাগারটির উদ্বোধন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার। পাঠাগারটির নাম দেওয়া হয়েছে‘আলোর উঠান’। পবার ইউএনও মো. সোহরাব হোসেন পাঠাগারটি গড়ে তুলেছেন নিজ উদ্যোগে। তাঁর এমন উদ্যোগের প্রশংসা করছেন বইপ্রেমী পাঠক, লেখক, সুধীজনেরা। সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে পাঠাগারের পাশে গোল ঘরে বসে বই পড়ছিল পবার নওহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাসনিমের হাতে হুমায়ূন আহমেদের‘মাতালহাওয়া’। সপ্তম শ্রেণির সাফিয়া তাসনিমের হাতে হুমায়ূন আহমেদের‘নির্বাচিত ভূতের গল্প’। নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী রুফাইদা ফেরদৌসের হাতে দেখা গেল সৈয়দ শামসুল হকের‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’। অষ্টম শ্রেণির পুষ্পিতা পূর্ণার মনোযোগও বইয়ের পাতায়।
রুফাইদা ফেরদৌস বলল, দুদিন আগে তারা খবর পেয়েছে- যে স্কুলের কাছেই এমন একটি পাঠাগার করা হয়েছে। তাই ক্লাস শেষে তারা কয়েক জন এসেছে পাঠাগারটি দেখতে। আসার পরে তারা নিজেরাই পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়ছে। এই পাঠাগারের পরিবেশ তাদের অনেক আকর্ষণীয় লাগছে আলাপচারিতায় জানান।
বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে পুষ্পিতা পূর্ণা বলল,‘মাঝে মাঝেই তো আমাদের বিভিন্ন ইভেন্ট থাকে এখানে। তখন আসতে হয়। এখন থেকে যতবার আসব, ততবার এই পাঠাগারে বসব।’
এই ব্যতিক্রমধর্মী পাঠাগারের বিষয়ে জানার পর রাজশাহী এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বই উপহার দিয়েছেন এসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য আকবারুল হাসান মিল্লাত।
উপজেলার নিকটবর্তী শিশু সাহিত্যিক হাসনাত আমজাদ এর বাড়ি। খবর পেয়ে তিনিও এসেছেন ভিন্নধর্মী এ-ই পাঠাগার দেখতে। সাথে নিয়ে এসেছেন নিজের লেখা দুটো ছড়ার বই- ‘মাঠের ছবি ঘাটের ছবি’ আর ‘যাই হারিয়ে ছেলেবেলায়’। বই দুটি পাঠকদের পড়ার উদ্দেশ্যে পাঠাগারে উপহার দেয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হাতে তুলে দিলেন তিনি। এ বিষয়ে তাঁর অনূভুতি জানতে চাইলে তিনি জানালেন- ‘আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। প্রচুর বই পড়তাম আমরা। বিনোদন ও জ্ঞান অর্জন দুই দিকেই লাভবান হতাম। এখন সময় বদলেছে। বই পড়ার দিকে আগ্রহ অনেক কম এখনকার ছেলেমেয়েদের। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এ-ই সময়ে আলোর উঠান চমৎকার এক উদ্যোগ। এ-ই জাতীয় উদ্যোগ বিভিন্ন পর্যায় থেকেও নেয়া উচিত।’
পবায় এ দিন উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম দেখতে এসেছিলেন মৌলিক প্রশিক্ষণে থাকা বিসিএস ক্যাডারের ১০ জন নবীন কর্মকর্তা। ইউএনও সোহরাব হোসেন উপজেলা প্রশাসনের নানা কার্যক্রম দেখানোর পর তাদের এই পাঠাগারটি দেখাতে আনেন। এমন উদ্যোগের প্রশংসা করতে দেখা গেল বুনিয়াদী প্রশিক্ষণরত এসকল নবীন কর্মকর্তাদেরও। বললেন, এমন উদ্যোগ তারা এর আগে দেখেননি।
কথা হয় ইউএনও সোহরাব হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, এখন সবাই ভার্চুয়াল মাধ্যমেই ডুবে থাকছেন। অফিস থেকে বাসায় যাতায়াতের সময় লক্ষ্য করেন, উপজেলা পরিষদে সেবা নিতে আসা মানুষকে কোন কারণে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে এখানে-ওখানে বসে তারা মোবাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তাই তাদের সময়টাকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং আনন্দময় করে তুলতে ও বিভিন্ন সময়ে পরিষদে আসা শিক্ষার্থীদের বইপড়ায় উৎসাহী করে তুলতে ছোট্ট এই পাঠাগারটি গড়ে তুলেছেন তিনি।
ইউএনও জানান, তাঁর কার্যালয় থেকে একটি ফরম নিয়ে পূরণ করে নিবন্ধিত পাঠক হতে পারবেন যে কেউ। তারা পাঠাগার থেকে বই বাড়িও নিয়ে যেতে পারবেন। যারা নিবন্ধিত পাঠক নন, তাদের পাঠাগারের পাশেই গোল ঘরে বই পড়ে আবার এখানে রেখে দিতে হবে।
এই পাঠাগারের পাঠকদের বিশেষত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে যারা বেশি সংখ্যক বই পড়ে বুক রিভিউ জমা দিবে তাদেরকে উৎসাহিত করতে পুরস্কৃত করার পরিকল্পনার কথাও জানান ইউএনও। তিনি বলেন, নিবন্ধিত পাঠক যেসব বই পড়বেন তার পর্যালোচনা লিখে তিনি জমা দেবেন। পাঠাগারের পরিচালনার জন্য একটি কমিটি থাকবে। সেই কমিটি প্রতি ছয় মাস পরপর সেরা পাঠক নির্বাচিত করবেন তাদের লেখা বইয়ের পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করে। এতে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।
পাঠাগারটি উন্মুক্ত স্থানে কিন্তু সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে তবে সার্বক্ষণিক কোন লক থাকবেনা। বই চুরি যাওয়ার ভয় আছে কি না, এমন প্রশ্নে ইউএনও বলেন, ‘পাঠক যদি পড়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে যান, তাহলে সেটা খুব বড় অপরাধ বলে মনে করি না। কিন্তু পেশাদার কোন চোর বিক্রির উদ্দেশ্যে বই চুরি করতে এলে সেটা অপরাধ। সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


এই বিভাগের আরো খবর