বৈসারান ভ্যালিতে হামলার পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী
এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সক্রিয়তায় উপদ্রুত কাশ্মীরে গত কয়েক বছরে যে ‘তুলনামূলক শান্তি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পহেলগামের ঘটনা সেটাকেও ছিন্নভিন্ন করে দেবে এই আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে পুরো মাত্রায়।মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে পহেলগামের যে বৈসরান ভ্যালিতে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে, সেটি আসলে কাশ্মীরের আলপাইন বেল্টের পাইন অরণ্যে ঘেরা ছবির মতো এক ফালি তৃণভূমি – যাকে অনেকেই আদর করে ডাকতেন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে। গত কয়েক বছরে এই পহেলগামসহ গোটা কাশ্মীর ভ্যালিতে যে লাখ লাখ পর্যটকের ঢল নেমেছিল, তারাও নিশ্চিতভাবেই এবার আতঙ্কে উপত্যকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন – ফলে ব্যবসা ও রুজিরোজগার হারানোর ভয়ও চেপে বসেছে সাধারণ কাশ্মীরিদের মধ্যে।
পহেলগাম হামলায় নিহত আদিল হুসেন শাহর জানাজায় কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাসহ আরও অনেকে
‘কাশ্মীরে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’
লন্ডনভিত্তিক লেখক ও জিওপলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট প্রিয়জিত দেবসরকার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ে চর্চা করছেন দীর্ঘকাল ধরে। তিনি মনে করেন, পহেলগামের আক্রমণ স্পষ্টতই কাশ্মীর বিতর্কের দিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য পাকিস্তানের একটা মরিয়া চেষ্টা।
তিনি বলছিলেন, ‘মাত্র গত সপ্তাহেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির একটি প্রকাশ্য সভায় কাশ্মীরকে ইসলামাবাদের জুগুলার ভেইন (প্রধান রক্তবাহী শিরা) বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার কয়েক দিনের মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ড– দুটোর মধ্যে সম্পর্ক থাকাটা খুব স্বাভাবিক!’
‘আসলে হিন্দু ও মুসলিমরা যে কখনোই শান্তিতে পাশাপাশি থাকতে পারে না – উপমহাদেশের এই বিভাজনমূলক ন্যারেটিভেরই প্রতিফলন ঘটেছে আসিম মুনিরের ওই মন্তব্যে। ভারতে ’৪৭-র দেশভাগের পর যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, তার মূলেও আছে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসটাই’, জানাচ্ছেন তিনি।
প্রিয়জিত দেবসরকার আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পাকিস্তান নিজে এখন একটা চূড়ান্ত অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে – যার একটা বড় কারণ অশান্ত বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহিংসতা। ‘তার ওপর আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনও কাশ্মীর ইস্যুকে তেমন একটা গুরুত্বটা দিচ্ছে না, কাজেই কাশ্মীরকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসাটা পাকিস্তানের জন্য খুব জরুরি ছিল’, বলছিলেন তিনি।
পহেলগামের হামলা যে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বিরাট একটা ধাক্কা দেবে, সে কথা তিনিও মানেন। সেই সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে একটা ‘আত্মসন্তুষ্টির ভাব’ চলে এসেছিল সেটা থেকেও হয়তো পহেলগাম তাদের বের করে আনবে বলে ধারণা তার। দেবসরকার আরও বলছিলেন, ‘ক্ষতি যেটা হবে তা হলো কাশ্মীরের পর্যটনের। গত কয়েক বছরে পর্যটকদের জন্য কাশ্মীরের জীবন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পহেলগাম সেই ঝকঝকে ছবিটায় একটা কালো ক্ষতস্থান তৈরি করে দিলো।’
‘একাত্তরের অসম্পূর্ণ কাজ মোদির এখন শেষ করা দরকার’
দিল্লিতে দক্ষিণপন্থি চিন্তাবিদ ও ফরেন পলিসি এক্সপার্ট শুভ্রকমল দত্ত আবার বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানকে চরমতম আঘাত হানার জন্য পহেলগাম মোদির কাছে একটা উপযুক্ত সুযোগ এনে দিয়েছে। ‘সিন্ধু চুক্তি থেকে ভারতের বেরিয়ে আসা কিংবা পাকিস্তানের ডিপ্লোম্যাটদের বহিষ্কার করা, এগুলো অবশ্যই ভালো কূটনৈতিক পদক্ষেপ। কিন্তু এটা আসলে আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সেরা সময়, কারণ পহেলগামের পর বিশ্ব জনমত ভারতের পক্ষে আছে!’, বলছিলেন ড. দত্ত।
কিন্তু কী হতে পারে সেই চরমতম পদক্ষেপ? শুভ্রকমল দত্তর কথায়, ‘একাত্তরে পাকিস্তান দু’টুকরো হয়েছিল – কিন্তু এখন আসলে সময় এসেছে এই ‘টেরোরিস্তান’ দেশটাকেই মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার।’‘আমাদের উচিত হবে পাকিস্তানের ভেতর থেকে স্বাধীন বেলুচিস্তান এবং স্বাধীন সিন্ধ-খাইবার পাখতোনওয়ালা তৈরির জন্য সর্বতোভাবে মদত দেওয়া। পাকিস্তানকে টুকরো টুকরো করে একাত্তরের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে পারলে তবেই এই কাশ্মীরে তাদের প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের পাকাপাকি অবসান হবে’, বলছেন তিনি।
‘পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরে বা গিলগিট বালটিস্তানে গিয়ে একদিন হিন্দুরা নবরাত্রির খাবার খাবেন, এটা ভারতীয় হিন্দুদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন কেউ যদি পূরণ করতে পারেন তাহলে নরেন্দ্র মোদিই পারবেন, আর সেই অভিযান শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময় বলে আমি মনে করি’, অভিমত শুভ্রকমল দত্তর।
‘মোদির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’
নরেন্দ্র মোদির জীবনীকার ও সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় কিন্তু মনে করছেন, মোদির সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে পহেলগামের মতো বড় চ্যালেঞ্জ আর আসেনি!‘আপনি দৃশ্যটা কল্পনা করুন, কাশ্মীর বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের কলমা পড়তে বলে যাচাই করা হচ্ছে তারা হিন্দু না মুসলিম … তারপর বেছে বেছে হিন্দু পুরুষদের গুলি করে তাদের স্ত্রী-মেয়েকে বলা হচ্ছে ‘যা মোদিকে গিয়ে বল’ – এখন হিন্দুহৃদয়সম্রাট বলে যিনি ভক্তদের মনে জায়গা করেছেন তিনি যদি এই অপমানের জবাব না দেন তো কীসের জবাব দেবেন?’, বলছিলেন নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
আর নরেন্দ্র মোদির জবাবটাও যে সামরিক হবে, তা নিয়েও কোনও সংশয় নেই তার। ‘অবশ্যই এটা একটা সিকিউরিটি রেসপন্স হবে, আর ভারতের রাজনৈতিক ন্যারেটিভেও সেই পদক্ষেপের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী’, বলছিলেন তিনি।
‘আসলে বিজেপি এতদিন বলে এসেছে তাদের ‘মাস্কুলার সিকিউরিটি পশ্চারিং’ বা কঠোর নিরাপত্তাগত অবস্থান এবং সীমান্তের অন্য পারে গিয়ে চালানো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ক্রস বর্ডার টেরোরিজমকে সফলভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে। পহেলগাম যদি সেই দাবিটাকে নিয়েই প্রশ্ন তোলে তাহলে তো নিজেদের অবস্থানকে জাস্টিফাই করতে বিজেপিকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে, তাই না?’
‘এখন মোদি সেটা কালকেও নিতে পারেন, কয়েকদিন পরেও নিতে পারেন। ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেন, তাতে ভারতের ধর্মীয় মেরুকরণও আরও গভীর হতে পারে। বিশ্বে শুল্ক নিয়ে আগে থেকেই তোলপাড় চলছে, তাতে ভারতের অর্থনীতিও আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদিকে একটা কিছু রেসপন্স করতেই হবে – কারণ কিছু না করাটা তার জন্য কোনও অপশন নয়!’, বলছিলেন নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়। এই পটভূমিতেই পহেলগামের হত্যাকাণ্ড সমকালীন ভারতের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক মোড় হয়ে উঠতে পারে, এমনটাই মনে করছেন তিনি।
‘নরেন্দ্র মোদির ন্যারেটিভই প্রশ্নের মুখে’
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অজয় দর্শন বেহেড়ার মতে, পহেলগামের হামলা যে পাকিস্তানের মদতেই হয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই – কিন্তু কূটনৈতিকভাবে বিশ্বের কাছে সেটা প্রমাণ করতে ভারতকে অনেক মেহনত করতে হবে।অধ্যাপক বেহেড়া বলেন, পহেলগামের হামলা এমন কোনও ঘটনা নয় ভারত যার জবাবে নীরব থাকতে পারবে, খুব কড়া একটা জবাব তাদের দিতেই হবে – সে যেভাবেই হোক না কেন! তার কথায়, ‘এই হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের কোনও ‘স্টেট অ্যাক্টর’ বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার নাম করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু গোটা বিষয়টাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হলমার্ক বা ছাপ একেবারে স্পষ্ট।’
‘নইলে যেরকম পেশাদার উপায়ে গোটা অপারেশনটা চালানো হয়েছে, হামলার লোকেশন ও সেখান থেকে বেরোনোর এক্সিট রুট যেভাবে বাছা হয়েছে, হামলার টাইমিংটা যে রকম ছিল – তাতে একটা মেটিকিউলাস প্ল্যানিং-এর প্রমাণ আছে ছত্রে ছত্রে, যেটা কোনও সাধারণ স্থানীয় গোষ্ঠীর কাজ হতেই পারে না!’
তিনি আরও মনে করেন, ২০১৯ সালে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করার পর মোদি সরকার সেখানে যে উন্নয়নের ন্যারেটিভ তুলে ধরতে চাইছিল সেটাও এখন বিরাট একটা হোঁচট খেতে বাধ্য। অধ্যাপক বেহেড়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘৩৭০ ধারা বিলোপের পর সরকার বারবার নিরাপত্তা পরিস্থিতির দারুণ উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করে এসেছে। সেই নিরাপত্তা কেন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো, সেই জবাবদিহিও কিন্তু তাদের করতে হবে।’
পহেলগামে যখন সন্ত্রাসবাদীরা হামলা চালায় তখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে ছিলেন – এবং হামলার টাইমিং বাছার সঙ্গে এর একটা যোগসূত্র আছে বলেও মনে করেন অজয় দর্শন বেহেড়া। ‘মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের সফর চলাকালীন হামলা চালিয়ে সারা দুনিয়াকে এই বার্তাটাই দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যে কাশ্মীর ইস্যুর কিন্তু এখনও নিষ্পত্তি হয়নি – এটি এখনও একটি বিতর্কিত বিষয়। ভারতও এই মোটিভটা জানে, ফলে এখন তারা কীভাবে বৈশ্বিক কূটনৈতিক পর্যায়ে সেটার মোকাবিলা করে, তাও কিন্তু দেখার বিষয় হবে’, বলছিলেন তিনি।












