বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

ফুসফুসের নীরব শত্রু : রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস

নিউজ ডেস্ক
আপডেট : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

মানবজাতির ইতিহাসে এমন অনেক রোগজীবাণু রয়েছে যারা নীরব ঘাতকের মতো আমাদের সমাজে এসেছে এবং দুর্বলদের সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করছে। রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস বা RSV (Respiratory syncytial virus) তেমনই একটি রহস্যময় এবং অত্যন্ত সংক্রামক জীবাণু, যা প্রায় প্রতিটি শিশুকে তাদের জীবনের প্রথম দুই বছরের মধ্যে একবার হলেও সংক্রমিত করে। এটি এমন একটি ভাইরাস যার নাম হয়তো অনেকেই শোনেননি, কিন্তু এটি বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ শিশুর ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটিয়ে চলেছে।

এই নতুন ভাইরাসটিকে প্রথমে তারা নাম দিয়েছিলেন ‘শিম্পাঞ্জি কোরিজা এজেন্ট’ বা CCA (Chimpanzee Coryza Agent)। এটিই ছিল মানব ইতিহাসে RSV-এর প্রথম দেখা পাওয়ার ঘটনা।

এর ঠিক এক বছর পর ১৯৫৭ সালে, আরেকজন বিখ্যাত আমেরিকান ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, রবার্ট এম. চ্যানক (Robert M. Chanock), ঠিক একই ধরনের ভাইরাস খুঁজে পান শিশুদের মধ্যে। এই শিশুরা তখন গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল।

গবেষকরা দ্রুত বুঝতে পারলেন যে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে পাওয়া CCA এবং শিশুদের মধ্যে পাওয়া এই ভাইরাস আসলে একই। যেহেতু এটি ফুসফুসের কোষগুলো একসাথে মিশে গিয়ে বা ফিউজড হয়ে বড়, বহুকোষী কাঠামো তৈরি করে, যাকে বলা হয় ‘সিনসিশিয়া’ (Syncytia), তাই এর নাম দেওয়া হলো রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (RSV)। এভাবে আমেরিকাতেই এর প্রথম বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণ সম্পন্ন হয়, যদিও এর অস্তিত্ব বিশ্বের বহু দেশেই আগে থেকে ছিল।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (RSV) হলো, এক প্রকার আরএনএ (RNA) ভাইরাস, যা Pneumoviridae পরিবারের অন্তর্গত।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি বিভিন্ন ভাগে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।

শ্বাসযন্ত্রের ফোঁটা (Respiratory Droplets)-এর মাধ্যমে RSV সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। সংক্রামিত ব্যক্তি যখন হাঁচি বা কাশি দেন, তখন ভাইরাসসহ কণাগুলো বাতাসের মাধ্যমে বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির চোখ, নাক বা মুখে প্রবেশ করে।

এছাড়াও ভাইরাসটি খেলনা, দরজার হাতল বা যেকোনো কঠিন বস্তুর ওপর কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সেই বস্তু স্পর্শ করার পর মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করলে সংক্রমণ ঘটে।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ করে এবং যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস প্রধানত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়, যা হালকা ঠান্ডা লাগার মতো উপসর্গ (নাক দিয়ে জল পড়া, কাশি, হাঁচি) থেকে শুরু করে শিশুদের মধ্যে ব্রঙ্কিওলাইটিস (ছোট শ্বাসনালীর প্রদাহ) ও নিউমোনিয়া (ফুসফুসের সংক্রমণ) এর মতো গুরুতর ও প্রাণঘাতী রোগ পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ছোট বাচ্চা এবং বয়স্কদের মধ্যে।

ভাইরাসটি ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের ছোট ছোট শ্বাসনালীকে (Bronchioles) সংক্রামিত করে, যার ফলে ফুসফুসের সেই অংশগুলো ফুলে যায় এবং শ্লেষ্মা বা মিউকাস দ্বারা বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই বলে ব্রঙ্কিওলাইটিস যা শিশুদের জন্য খুব বিপজ্জনক।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ করে এবং যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত এর লক্ষণগুলো সাধারণ সর্দি-কাশির মতো হালকা হয়।

তবে এই ভাইরাসটি মূলত শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত ৬ মাস বা তার কম বয়সী শিশুরা এবং অকালজাত শিশুরা (Premature babies) এবং এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির অন্যতম প্রধান কারণ এটি।

শিশুদের ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস

নাক দিয়ে জল পড়া ও বন্ধ থাকা, জ্বর, হাঁচি, তীব্র কাশি, কখনো কখনো শ্বাসকষ্টসহ, খাবার খেতে অনীহা বা খাওয়ায় সমস্যা দেখা যায়। তবে কখনো কখনো দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।

যদিও বেশিরভাগ রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস সংক্রমণ নিজে থেকেই সেরে যায়, তবুও ছোট বাচ্চা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে, তাই লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তবে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস সাধারণত একটি মৌসুমি ভাইরাস। এটি অন্য অনেক শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের মতো শরৎকালের শেষ দিক থেকে বসন্তের শুরু পর্যন্ত বাড়ে, অর্থাৎ শীতল আবহাওয়ার সময় এর প্রকোপ বাড়ে। তবে জলবায়ু এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এর সময়কাল কিছুটা পরিবর্তিত হত পারে।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস যেহেতু একটি ভাইরাস, তাই সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মতো এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণ নির্ভর (Supportive) এবং এর লক্ষ্য হলো লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করে রোগীকে আরাম দেওয়া।

বাড়িতে পরিচর্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, হালকা লক্ষণযুক্ত শিশুরা বাড়িতেই বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল পান করে সেরে ওঠে। প্রয়োজনে জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে (অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী)।

হাসপাতালে ভর্তিও প্রয়োজন হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে, যেমন শ্বাসকষ্ট বা ডিহাইড্রেশন হলে, হাসপাতালে ভর্তি জরুরি। সেখানে অক্সিজেন থেরাপি, শিরায় তরল (IV fluids) দেওয়া হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তার জন্য নেবুলাইজেশন দেওয়া লাগতে পারে। রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস-এর জন্য সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় না, কারণ এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নয়।

প্রতিরোধমূলক ওষুধগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য, বিশেষ করে প্রি-ম্যাচিউর শিশুদের ক্ষেত্রে, সংক্রমণ গুরুতর হওয়া এড়াতে প্রতি মাসে একবার প্যালিলিভিজুমাব (Palivizumab) নামে একটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ইনজেকশন দেওয়া যেতে পারে।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস সাধারণত একটি মৌসুমি ভাইরাস। এটি অন্য অনেক শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের মতো শরৎকালের শেষ দিক থেকে বসন্তের শুরু পর্যন্ত বাড়ে, অর্থাৎ শীতল আবহাওয়ার সময় এর প্রকোপ বাড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। কারণ প্রতিরোধ বা প্রতিকারই হলো এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

টিকা (Vaccines) যা বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের এবং গর্ভাবস্থার শেষের দিকে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা অনুমোদিত হয়েছে। গর্ভবতী মাকে টিকা দিলে শিশুর জন্মের পর প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাসজনিত গুরুতর রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।

এছাড়া মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি শিশুদের গুরুতর রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস থেকে রক্ষা করার জন্য নতুন একক-ডোজের মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (যেমন Nirsevimab) এখন সহজলভ্য।

তবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিশেষ করে বারবার সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া,

অসুস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা,

খেলনা-বিছানা এবং অন্যান্য ঘন ঘন ব্যবহৃত জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখা, শিশুদের চুম্বন না করা বা স্পর্শ করার আগে হাত পরিষ্কার করা এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে খুবই জরুরি।

রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস-এর আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের টিকা এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পর্যন্ত, আমরা শিখছি কীভাবে এই নীরব শত্রুকে পরাজিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

ডা. কাকলী হালদার : এমবিবিএস, এমডি (মাইক্রোবায়োলজি), সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ


এই বিভাগের আরো খবর