অফিসে প্রচুর কাজের চাপ? এক কাপ গরম কফি খেয়ে তরতাজা হয়ে কাজে হাত দিলেন। বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় মুচমুচে স্ন্যাক্স সহযোগে গরম কফির পেয়ালা হাতে উঠলে আড্ডাটা আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। সঙ্গীকে নিয়ে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়ে কোথাও বসে এক কাপ কোল্ড কফি না খেলে কী আর হয়! অনেকের তো সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতে কফির মগ তুলে না নিলে দিনটাই ভাল যায় না। সকাল থেকে রাত, আনন্দে হোক বা ক্লান্তিতে— কফি আছে সবেতেই। কিন্তু ঘন ঘন কফি খাওয়ার যে অভ্যাস, তা যে প্রজনন ক্ষমতার উপরে প্রভাব ফেলে, তা জানা আছে কি?
এই বিষয়ে মেডিসিনের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদারের মত, “ক্যাফিন যেমন ভাল, তেমনই ক্ষতিকর। এক কাপ কফিতে প্রায় ৭০ থেকে ১৪০ মিলিগ্রাম ক্যাফিন থাকে। কফি খাওয়ার সময়ে এই পরিমাণটা ভুললে চলবে না। এক কাপ কফিতে কতটা পরিমাণ কফি দিচ্ছেন, তার উপর নির্ভর করছে সব। সেই হিসাবে দিনে তিন কাপের বেশি কফি না খাওয়াই ভাল। চা-ও তাই। দিনে দুই থেকে তিন কাপ চা খেলে ক্ষতি নেই। কিন্তু তা সাত থেকে আট কাপ ছাড়িয়ে গেলেই বিপদ।”
মানুষের শরীরে দু’রকম সিস্টেম আছে— সিম্প্যাথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক। সিম্প্যাথেটিক সিস্টেমে অত্যধিক প্রদাহ তৈরি হলে তখন রক্তচাপ বেড়ে যায়, শ্বাসের গতি বাড়ে, নাড়ির গতি বাড়ে, শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। আবার ঠিক উল্টোটা হয় প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমের ক্ষেত্রে। ক্যাফিন সিম্প্যাথেটিক ও প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলিকেই সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এমনটাই বলছেন কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্ত্রীরোগ চিকিৎসক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “রোজ পাঁচ থেকে ছয় কাপ বা তার বেশি কফি খান যাঁরা, তাঁদের শরীরে এত বেশি ক্যাফিন ঢোকে যা সিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকে ‘স্টিমুলেট’ করে। অর্থাৎ, উদ্দীপনা বাড়ায়। এতে শরীরের তাপমাত্রাও বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে জনন অঙ্গের উপরে। হরমোনের তারতম্য দেখা দেয়, শুক্রাশয়ে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া ও জরায়ুতে ডিম্বানু তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নষ্ট হতে শুরু করে।”
দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মতো ক্যাফিন শরীর সয়ে নিতে পারে। কিন্তু দৈনিক ক্যাফিনের মাত্রা যদি ৩০০ মিলিগ্রাম ছাড়িয়ে যায়, তা হলে হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যেতে থাকে। মহিলাদের ইস্ট্রোজেন নামক যৌন হরমোনেরই একটি রূপ এস্ট্রাডিওল হরমোন ও প্রজেস্টেরনের ক্ষরণ এলোমেলো হয়ে যায়। মল্লিনাথ বলেন, ‘‘এই দুই হরমোনের তারতম্য দেখা দিলে মাসিক ঋতুচক্রের প্রক্রিয়াও অনিয়মিত হতে শুরু করে। ফলে ডিম্বাণু নিঃসরণের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উর্বরতা কমতে শুরু করে।’’
পুরুষদের ক্ষেত্রেও টেস্টোস্টেরন ক্ষরণের প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দিতে পারে অতিরিক্ত ক্যাফিন। এখানে আরও একটি বিষয় আছে। শুক্রাশয়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রা শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কম থাকে। কারণ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য শুক্রাশয়ের নিম্ন তাপমাত্রাই জরুরি। কোনও কারণে যদি শুক্রাশয়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তা হলে দু’রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে— ১) শুক্রাণু উৎপাদনের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ২) ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশন’-এর সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্যাফিন যদি বেশি পরিমাণে শরীরে জমা হতে থাকে, তা হলে এই দুই সমস্যাই বড় হয়ে দেখা দেবে। শুক্রাণুর ঘনত্ব ও গুণমানও কমতে থাকবে। এর থেকে বন্ধ্যাত্বের সমস্যাও আসতে পারে।