রাজশাহী জেলার অধিকাংশ চাষি ও কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার লিচুর উৎপাদন হবে ভালো। এ বছর রাজশাহীতে ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগমারা উপজেলায় ১১৫ হেক্টর জমিতে লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৮২৫ মেট্রিক টন। এ ছাড়াও সবচেয়ে কম নগরীর বোয়ালিয়া থানায় ১০ হেক্টর জমিতে লিচুর লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭০ মেট্রিক টন। এ ছাড়াও পুঠিয়া উপজেলায় ৭৮ হেক্টর, পবা উপজেলায় ৭৫ হেক্টর, দুর্গাপুরে ৭০ হেক্টর, মোহনপুরে ৫২ হেক্টর, চারঘাটে ৪৫ হেক্টর, তানোর উপজেলায় ৩০ হেক্টর, বাঘা উপজেলায় ২৮ হেক্টর, মতিহারে ২০ হেক্টর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় ১৯ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে।
রাজশাহী নগরীর শালবাগান বাজারের লিচু ব্যবসায়ী ইয়াসিন আলী জানান, তিনি ১০ বছর ধরে এই লিচু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবার প্রায় ১০ একর বাগান লিজ নিয়েছেন। বাগানগুলোতে চায়না-৩, বোম্বে ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকার পাইকাররা আগাম গাছের লিচু কিনতে শুরু করেছেন। তিনি আরও জানান, প্রতি দিন ৪০ জন শ্রমিক লিচু বাগানে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের তিন বেলা খাবার ও পকেট খরচসহ শ্রমিকপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকা দিতে হয়। নিয়মিত পরিচর্যা ও বালাইনাশক ওষুধ দিতে হয়। এ বছর খরচ বেশি হওয়ায় লিচুর দামটাও একটু বেশি হবে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের লিচুর চাষি সুলতান বলেন, আবহাওয়া যদি শেষ পর্যন্ত ভালো থাকে তবে এবার লিচুর ফলনও ভালো হবে। গাছ থেকে লিচু যেন পড়ে না যায়, সে জন্য পর্যাপ্ত পানি দেওয়া হচ্ছে। কাঁঠবিড়ালি আর বাদুড় যাতে নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য জালের ব্যবস্থা করা হবে। লিচুর পরাগায়ণ বৃদ্ধি করতে বাগানে একজন মৌচাষিকে মৌ-বাক্সও বসাতে দিয়েছি।
পুঠিয়া উপজেলার জিউপাড়া এলাকার লিচু চাষি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ বছর লিচু গাছে মুকুলের পরিমাণ বেশি এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং সময় মতো পরিচর্যা করা হলে চলতি মৌসুমে লিচুর ভালো ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ বছরে লিচুর মুকুল আসার সময় হালকা বৃষ্টি হওয়ার কারণে পূর্ণাঙ্গ মুকুল বের হয়েছে। এসব মুকুল থেকে গুটি ফুটে বড় আকার ধারণ করতে শুরু করেছে।
রাজশাহী নগরীর মোল্লাপাড়া এলাকার চাষি আলিউল হক জানান, বর্তমানে এই বাগানগুলোর লিচুর গাছে দেখা মিলেছে গুটির। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে লিচু গাছে মুকুল আসে এবং মে মাসের শেষে বা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে পরিপক্ব লিচু বাজারজাত করার উপযুক্ত হয়ে থাকে। লিচু চাষিরা সারা বছর তাদের লিচু গাছের যত্ন নেন বছরের এই স্বল্প সময়ে ফল বিক্রির জন্য। গুটির পর থেকে মাত্র দুই মাস থেকে তিন মাসের মধ্যে লিচু বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে থাকে। এই সময়ের মধ্যে লাভজনক মূল্যে লিচু বাজারজাত করতে না পারলে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবেন তারা। এসব বাগানে ফলন আশানুরূপ হলেও, দ্রুত পচনশীল লিচু সঠিক সময়ে বাজারজাত করাটাই এই মৌসুমের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন এই লিচু চাষি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এ বছর লিচুর চাষ হয়েছে ৫৩০ হেক্টর জমিতে। আর ২০১৬-১৭ মৌসুমে জেলায় মোট লিচুর চাষ হয়েছে ৪৮৯ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হয়েছিল ২ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন। ২০১৭-১৮ সালে এক একর বেড়ে মোট চাষের জমি দাঁড়ায় ৪৯০ হেক্টরে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে চাষের জমি বাড়ে আট হেক্টর। মোট ৪৯৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয় দুই হাজার ৮৭৬ মেট্রিক টন। সে বছর হেক্টর প্রতি উৎপাদন ছিল পাঁচ দশমিক ৭৮ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ মৌসুমে লিচুর আবাদ আরও দুই হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৫০০ হেক্টরে দাঁড়ায়। অপরদিকে ২০২০-২১ মৌসুমে ১৯ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ বৃদ্ধি পেয়ে মোট চাষের জমি দাঁড়ায় ৫১৯ হেক্টরে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোছা. উম্মে ছালমা বলেন, রাজশাহীর লিচু স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় এই জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই রয়েছে লিচুর বাগান। তাই এই ফলের চাষ খুবই লাভজনক। তবে কোনও মৌসুমে ফলন একটু কম আবার কোনও মৌসুমে বেশি হয়। তবে প্রতি বছর লিচুর আবাদ বাড়ছে। এ বছর রাজশাহীতে ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩৮০০ মেট্রিক টন। বর্তমানে লিচু গাছে দেখা মিলেছে গুটির। এই গুটি টিকিয়ে রাখতে চাষিরা পরিচর্যার কোনও কমতি রাখছেন না।







