দেবী দুর্গার পদতলে মহিষাসুর। পেছনে মানুষরূপী ১৫টি অসুরের মূর্তি। রণভঙ্গিতে সশস্ত্র নীল বর্ণা অভয়দাত্রী দেবী; যেন এগিয়ে চলেছেন দৃপ্ত পায়ে। এমন ভাবনাকেই মূর্ত রূপ দেওয়া হয়েছে এবার চট্টগ্রামের পাথরঘাটা বংশাল রোডের ঐতিহ্যবাহী পাঁচবাড়ি পূজা উদযাপন পরিষদের মণ্ডপে।১৯৫০ সালে শুরু হওয়া এই পূজোর বয়স এবার ৭৪ বছর। চট্টগ্রামে দুর্গা পূজায় ‘থিম‘ প্রচলনকারী মণ্ডপগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান পাঁচবাড়ির এই মণ্ডপ।এবারের প্রতিমা ভাবনার বিষয়ে পাঁচবাড়ি পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়জিৎ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবসময়ের মত মহিষাসুর তো আছেই। কিন্তু অসুর নানা রূপে থাকে আশেপাশেই। মানুষরূপী অসুরের সংখ্যা এখন বেশি। মা দুর্গার পিছনে যাদের দেখছেন, তারা সবাই মানুষরূপী অসুরের প্রতীক।“আর দেবী দুর্গা এবং গণেশ, কার্তিক, লহ্মী ও স্বরস্বতী এবার নীল বর্ণের। কারণ নীল রঙ হল প্রজ্ঞা, নির্ভরযোগ্যতা, শান্তি, অনুপ্রেরণা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।”পাঁচবাড়ির মণ্ডপের প্রতিমা শিল্পী বিশ্বজিৎ পাল লিটু ২০০০ সাল থেকে সেখানে প্রতিমা বানাচ্ছেন। তখন থেকেই থিম ধরে প্রতিমা গড়ার কথা বললেন তিনি।
নগরীর অন্যতম পুরনো পূজা ফিরিঙ্গিবাজারের শ্মশানেশ্বর শিব বিগ্রহ মন্দিরে এবার ৯৫তম মাতৃবন্দনা হচ্ছে। তাদের এবারের ভাবনা, ‘ইতিহাস হারিয়ে যায় কালের গহ্বরে, দেবতাদের স্থান হয়-মনুষ্য জাদুঘরে’। প্রতিমা শিল্পী রতন কৃষ্ণ পাল দেবী দুর্গাকে গড়েছেন পোড়ামাটির প্রতিমার আদলে। আরেক শিল্পী সৃজন দাশ মিঠুন মণ্ডপের দু’পাশে থাকা অন্যান্য প্রতিমা গড়েছেন কষ্টি পাথরের মূর্তির আদলে।
ফিরিঙ্গিবাজারের শ্মশানেশ্বর শিব বিগ্রহ মন্দিরে এবার ৯৫তম মাতৃবন্দনা হচ্ছে ‘মনুষ্য জাদুঘরে’ ভাবনার থিমে। নতুন প্রজন্মের কাছে দেবী দুর্গার ইতিহাস তুলে ধরতে এমন ভাবনা ঘিরে পূজার আয়োজন। দেবী প্রতিমা গড়া হয়েছে পোড়ামাটির প্রতিমার আদলে। আয়োজনের থিম নিয়ে শ্মশানেশ্বর শিব বিগ্রহ মন্দির পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য শোভন বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইতিহাস একসময় কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। এখন যা বর্তমান তা মুহূর্তে হয়ে যাচ্ছে অতীত। আমরা দেখি প্রাচীন যুগের বিভিন্ন প্রতিমা, কষ্টি পাথরের মূর্তি দেশের বিভিন্ন প্রত্মতাত্ত্বিক স্থান থেকে উদ্ধার হয়। সেগুলোর স্থান হয় জাদুঘরে। এসব মূর্তির কিছু কিছু পাচারও হয়ে যায়, এমন সংবাদও মিডিয়াতে দেখা যায়।“অথচ এসব দেব-দেবীর মূর্তি আমাদের অতীত ইতিহাস। যারা অতীতকে উপেক্ষা করে তাদের কোনো বর্তমানও নেই, ভবিষ্যতও নেই। এসব উদ্ধার হওয়া প্রতিমার স্থান হওয়া উচিত ছিল মন্দিরে আর মানুষের হৃদয়ে; তথা মনুষ্য জাদুঘরে। নতুন প্রজন্মকে সমৃদ্ধ ইতিহাস জানাতেই এই ভাবনা ঘিরে পূজার আয়োজন।”নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার গোসাইলডাঙ্গা একতা গোষ্ঠী সার্বজনীন দুর্গোৎসবের আয়োজন চট্টগ্রামের মানুষের পূজা পরিক্রমায় অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে প্রায় প্রতিবছর। ‘দুর্গা স্ব-রূপা’ থিমে এবার ১৩০তম বারের মত পূজার আয়োজন করেছে তারা।‘তোমার দুর্গা মাটির তৈরি, সেজে ওঠে অলংকারে, আমার দুর্গা মায়ের রূপে, ঠাঁই পায় না ঘরে’, ‘আমার দুর্গা ঘরে সংসারে অক্লান্ত খেটে চলে, আমার দুর্গা একটু কষ্টে ডাকে আয় খোকা বলে’, ‘আমার দুর্গা কাস্তে হাতুড়ি, আউশ ধানের মাঠে, আমার দুর্গা ত্রিশুল ধরেছে, স্বর্গে এবং মর্ত্যে’ এবং ‘তোমার দুর্গা বহুজাতিকের বহুজনহিতায়চ, আমার দুর্গা কালকে যেমন, আজো তথৈবচ’- এমন সব কবিতার পক্তির সঙ্গে ছবির দৃশ্যায়নে সেজেছে মণ্ডপটি।
একতা গোষ্ঠী সার্বজনীন দুর্গোৎসবের কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও মঞ্চ ভাবনাকারী শিল্পী জয় দাশ বলেন, “আমাদের সবার ঘরেই একজন করে মা দুর্গা থাকেন। সন্তানের কাছে তার নিজের মা তো দেবী দুর্গাই।” এবারের ভাবনার বিষয়ে এখানকার পূজা কমিটির অর্থ সম্পাদক শাওন চৌধুরী বলেন, “প্রতিবারই চট্টগ্রামবাসী নতুন কিছু চায়। তাদের চাওয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, এবারের নতুন ভাবনা। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৫ দিন আমরা শুধু দেবী মায়ের পূজা করি।“প্রতিটি ঘরেই আমরা সন্তানরা মায়ের উপর নির্ভরশীল। মায়ের মধ্যেই আমরা প্রতিদিন দেবী রূপকে খুঁজে পাই। একজন নারী পেশাজীবী বা গৃহিণী তিনিই আবার কারো মা, কারো বোন, কারো সহধর্মিনী। কিন্তু এই মাতৃরূপা নারীকেই প্রতিদিন পথ চলতে নিরাপত্তার শঙ্কায় থাকতে হয়।”প্রত্যেক নারীকে যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে পারলেই সকল নারীর বিকাশ সম্ভব। প্রতি মায়ের মধ্যেই একটি প্রতিমা আছে। এই ভাবনা সবাইকে অন্তরে ধারণ করতে হবে।”এছাড়া এবার নগরীর হাজারী লেইন পূজা উদযাপন পরিষদ, ঘাট ফরহাদ বেগ, নবগ্রহ বাড়ি এবং রাজাপুকুর লেইনের মণ্ডপ সজ্জা ও প্রতিমার গড়ন পুজার্থীদের নজর কেড়েছে।দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে আগমন ও প্রস্থানের সময় যে বাহন ব্যবহার করেন এর উপরে সারাবছর কেমন কাটবে, তা নির্ভর করে বলে ভক্তকূলের বিশ্বাস।পঞ্জিকা অনুসারে দেবীর আগমন ধরা হয় সপ্তমী তিথিতে। এবার সপ্তমী বৃহস্পতিবারে, তাই হিন্দু শাস্ত্রমতে দেবীর আগমন দোলা বা পালকিতে চড়ে। বিজয়া দশমীতে দেবী ছেলেমেয়েদের নিয়ে ফিরবেন কৈলাসে। রোববার দশমী হওয়ায়, দেবী ফিরবেন হাতির পিঠে চড়ে।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, দোলায় আগমনের কারণে হতে পারে মহামারী, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ ও প্রাণহানি। আর হাতিতে গমনের কারণে পূর্ণ হতে পারে ভক্তদের মনের ইচ্ছা, সুফল মিলতে পারে পরিশ্রমের আর সুখ-সমৃদ্ধির দেখা পেতে পারেন মর্ত্যলোকের বাসিন্দারা।এ বিষয়ে রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম চট্টগ্রামের সম্পাদক স্বামী শক্তিনাথানন্দ বলেন, “আগমন তো আমরা আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছি। আশেপাশে ভালো খবর নেই। এমনকি পুজোর সময়েও ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া আছে। “আগমন ও প্রস্থান বাহনের বিষয়টি মানুষের বিশ্বাস। প্রকৃতপক্ষে যার যার ভক্তি, ভাবনা ও নিবেদনের উপরই নির্ভর করেছে মাতৃবন্দনায় কার কী প্রাপ্তি ঘটবে।”ভক্তের ভক্তি নিবেদনের সুব্যবস্থা করার আশা পূরণের লক্ষ্যেই শেষ মুহূর্তের টানা প্রস্তুতি যুদ্ধ চলছে মণ্ডপে মণ্ডপে। শরতের অকাল বোধনে দেবী দুর্গার আগমন বাঙালি হিন্দুর কাছে যে নিজের মেয়ের প্রতি বছর পিতৃ গৃহে ফেরাও বটে।যে কারণে কন্যা বরণের শেষ কয়েক ঘণ্টার প্রাণান্ত সকল প্রচেষ্টা ভরা অকৃত্রিম আন্তরিকতায়। এর শেষ হবে বিজয়া দশমীতে চোখের জলে মাতৃরূপী দেবী তথা কন্যা বিদায়ের মধ্য দিয়ে।