জঙ্গি বিষয়ে কাজ করে ঢাকায় পুলিশের এমন কিছু সূত্র বলছে, টিটিপির জন্য বাংলাদেশ থেকে জনবল সংগ্রহ করার একটি প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই সক্রিয় আছে, যার নেতৃত্বে আছেন ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামের এক ব্যক্তি। গত জুলাইয়ে পুলিশেরই দায়ের করা একটি মামলার এজাহারে এই তথ্য পাওয়া যায়।
এছাড়া বাংলাদেশে সক্রিয় জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়া নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগসূত্র আছে বলেও পুলিশ ও জঙ্গি বিষয়ক গবেষকরা বলে থাকেন। আল-কায়েদার সাথে আবার যোগসূত্র আছে টিটিপির।
পুলিশের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেছেন, টিটিপির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন দু’জনকে গত জুলাইয়ে আটকের পর বাংলাদেশের ভেতরে এর নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
টিটিপি মূলত পাকিস্তানের পাঠান মাদ্রাসা ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনের একটি জোট। ২০০৭ সালে বাইতুল্লাহ মেহ্সুদের নেতৃত্বে ১৩টি সংগঠন মিলে টিটিপি গঠিত হয়। জোট গঠনের পর থেকেই টিটিপির মধ্যে দলীয় কোন্দল শুরু হয় এবং এর জেরে বেশ কয়েকটি উপদল তৈরি হয়। তবে ২০২০ সালে টিটিপি আবার এক হয়। তারা পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে মসজিদ ও স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার জন্য টিটিপিকে দায়ী করা হয়। তাদের হামলায় সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাকিস্তান সরকার ২০১৪ সালে টিটিপির সাথে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিলে তখন তা সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
এর মধ্যেই গত ছয় মাসে পাকিস্তানে দু’জন বাংলাদেশি তরুণ, যারা টিটিপির সদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মৃত্যুর খবর সামনে এলো। বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নজর রাখছেন মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন। তার মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি অনেক পুরোনো।
‘‘এমনকি বায়তুল মোকাররমের কাছে ব্যানার দিয়ে মুজাহিদ সংগ্রহের তৎপরতা দেখেছি আমরা। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যেও এ ধরনের রিক্রুটমেন্টের নজির আছে। তবে এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম। কিন্তু পুরোপুরি যে বন্ধ হয়নি সেটি পাকিস্তানে দু’জনের নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হলো।’’
বাংলাদেশে টিটিপির কার্যক্রমে জড়িতদের মধ্যে যারা আটক হয়েছে তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব কিংবা দুবাই হয়ে আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তানে পৌঁছায় টিটিপি নেটওয়ার্কের সদস্যরা।
এর মধ্যে একজনকে গত ২ জুলাই ঢাকার কাছে সাভার থেকে এবং অন্যজনকে ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট। তাদের দু’জনের বিরুদ্ধেই টিটিপির সাথে যোগসূত্র থাকার অভিযোগ আনা হয়।
আটক হয়ে কারাগারে যাওয়া ওই দু’জনের মধ্যে একজনকে আগেও পুলিশ জঙ্গি কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার অভিযোগে আটক করেছিল। ২০২৩ সালে র্যাব জানিয়েছিল, তিনি জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়া নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
এপ্রিলে পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে জুবায়ের নামে এক বাংলাদেশির নিহত হওয়ার তথ্য পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেছিল। দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছিল, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের রাজমাক এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওই অভিযান চালানো হয়।
এর বাইরে তখন আরও অন্তত ৩৫ জন বাংলাদেশিকে বালোচিস্তান থেকে আটক করার তথ্য নিরাপত্তা বাহিনীর বরাতে পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমে এসেছিল। বাংলাদেশে টিটিপির সাথে সম্পৃক্ত সন্দেহে একজনকে গত ২ জুলাই রাত ৯টার দিকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মোড়ে একটি দোকান থেকে আটক করে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট। আটকের পরদিন তাকে আদালতে উপস্থাপন করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়।
মামলায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক দু’জন ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকা ছেড়েছিলেন। কিন্তু ওমরাহ না করে তারা পরদিনই সৌদি আরব থেকে পাকিস্তানে যান। সেখান থেকে ৬ নভেম্বর তুরখান সীমান্ত দিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন।
একদিন পর ওই একই সীমান্ত দিয়ে তাদের একজন আবার পাকিস্তানে আসেন। এরপর করাচি থেকে দুবাই হয়ে ১৬ নভেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। কিন্তু তার সহযোগী অপর বাংলাদেশি পরে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন, যার নাম আহমেদ জুবায়ের ওরফে যুবরাজ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক একজন পুলিশকে এই তথ্য জানিয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার এজাহারে আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারাও ধর্মীয় উগ্রবাদী দীক্ষিত হয়ে জিহাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এই মামলার এজাহারেই বলা হয়, ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার নামে এক বাংলাদেশি টিটিপির হয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে। মূলত তিনি ওই সংগঠনের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন ও সদস্যদের সংঘবদ্ধ করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন। উক্ত আসামি বাংলাদেশে টিটিপির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির কার্যক্রম, সদস্যদের ইসলামী খিলাফতের দাওয়াত পৌঁছানোর কার্যক্রম পরিচালনা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদে উদ্বুদ্ধ করছে বলে মামলায় বলা হয়েছে।
ধারণা করা হয়, টিটিপির জন্য জনবল সংগ্রহে কাজ করছিল আটক ব্যক্তিদের একজন এবং তার সংগঠন। তারাই লোক বাছাই করে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সৌদি আরব বা দুবাই হয়ে পাকিস্তানে টিটিপির নেটওয়ার্কে লোক পাঠায় বলে পুলিশ সূত্রগুলোরও ধারণা। ২০২৩ সালের ২৩ জুন এই ব্যক্তি ও তার স্ত্রীকে ঢাকার ডেমরা থেকে অস্ত্রসহ আটক করেছিল তখনকার কাউন্টার টেরোরিজিম ইউনিট। তখন তাকে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করেছিল পুলিশ। বিবিসি বাংলা।