সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য আটক শিবির বানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক নিউজ
আপডেট : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

কথিত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ অনুপ্রবেশকারীদের আটক রাখার জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রত্যেক জেলায় ‌‘আটক শিবির’ বা ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সেখানকার ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও গত এক বছরে একই ধরনের আটক শিবির তৈরি করা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এই উদ্যোগ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবারই প্রথম নেওয়া হলো।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশ মেনে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যে হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা, যারা অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন বলে সন্দেহ, এমন অনেক মানুষকে আটক করে রাখা হয়। তবে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মধ্যে অনেকেই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক।

তাদের একটি বড় অংশই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওই সব রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক। গত বছর ২২ এপ্রিল ভারত শাসিত কাশ্মিরের পেহেলগামে বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর ভারতের অনেক রাজ্যেই কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছিল।

পরিচয় যাচাইয়ের পরে তাদের অনেককে ছেড়ে দেওয়া যেমন হয়েছে, তেমনই বেশ কিছু পরিবারকে বাংলাদেশে পুশ-আউট করে দেওয়া হয়েছে। এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে বিবিসি প্রতিবেদন করেছে। হোল্ডিং সেন্টার থেকেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, এমন কয়েকজনকে ফিরিয়েও এনেছে ভারত।

• কী এই হোল্ডিং সেন্টার?

তাদের মূলত আটক করা হতো বাংলায় কথা বলা দেখেই। একই সঙ্গে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ও আটক হওয়ার একটা বড় কারণ বলে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন অনেক আটক নারী-পুরুষ। তারা বলছেন, ওই সব হোল্ডিং সেন্টার আসলে কোনও কারাগার নয়। অস্থায়ীভাবে কোনও অনুষ্ঠানবাড়ি বা বড় অফিস প্রাঙ্গণ ব্যবহার করা হতো ওই হোল্ডিং সেন্টারের জন্য।

সেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষকে আটক রাখা হতো।

পুলিশ ওই সব মানুষদের আটক করার পর প্রাথমিকভাবে পরিচয় যাচাই করত। হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানোর পর তারা নিজেদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের যে অঞ্চলে বলে দাবি করেছেন, সেখানকার জেলা পুলিশের কাছে তথ্য চেয়ে পাঠিয়ে পরিচয় যাচাই করত। এতে অনেক সময়ে ছয়-সাত দিন বা তারও বেশি সময় লাগত। এই পুরো সময়টায় আটক হওয়া ব্যক্তিদের হোল্ডিং সেন্টার থেকে বেরোতে দেওয়া হতো না, বাইরে পুলিশ পাহারা থাকত।

খাবার দেওয়া হলেও তা অনেক সময়েই অপর্যাপ্ত ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক প্রমাণিত হওয়ার পরে যারা ছাড়া পেয়েছেন হোল্ডিং সেন্টারগুলো থেকে, তাদের মোবাইল ফোন রাখতে দেওয়া হতো না বলে অনেকে জানিয়েছেন।

আবার কয়েকজন হোল্ডিং সেন্টারে আটক হওয়ার সময়কার ছবি বা ভিডিও তুলে পরিবারের কাছে পাঠিয়েছেন, এমন ঘটনাও রয়েছে।

পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলেন, বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের হোল্ডিং সেন্টারে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক ও শিশুসহ, সাধারণ মানুষকেও আটক রাখা হয়েছিল। সেখানে হেনস্তা, নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তীতে দেখা গেছে, আটক হওয়া অনেকেই প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

• পুশ-ব্যাকের প্রথম ধাপ হোল্ডিং সেন্টার?

প্রাথমিকভাবে কথিত বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী হিসাবে আটক হওয়ার পর যারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পেরেছেন বা যাদের প্রমাণে ওইসব রাজ্যের স্থানীয় পুলিশ সন্তুষ্ট হয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড়া পাওয়ার পরে অনেকেই বলেছেন, তাদের সঙ্গে অনেক প্রকৃত বাংলাদেশিও ধরা পড়েছিলেন।

আবার ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয় পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ যাচাই করে পাঠিয়েছে। তারপরও তাদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে সীমান্তের অন্যদিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে;  এরকম অনেক ঘটনাই সামনে এসেছে।

এগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সোনালী খাতুন ও তার পরিবারকে বাংলাদেশে পুশ-আউট করে দেওয়ার ঘটনাটি বহুল আলোচিত। গর্ভবতী অবস্থায় সোনালী খাতুনসহ তার পরিবারের মোট ছয়জনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পরে শুধুমাত্র সন্তানসম্ভবা খাতুনকে ভারত সরকার ফিরিয়ে এনেছে।

আবার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এমন একজন ছিলেন মুর্শিদাবাদের মেহবুব শেখ। তাকে ভারতে ফিরিয়ে আনার পরে বিবিসি তার বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে। ওই সময়ই মুম্বাই থেকে আটক হয়েছিলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার মূল বাসিন্দা মুস্তাফা কামাল শেখ। তাকেও ভারত সরকার ফিরিয়ে এনেছিল।

ভারতের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করতে গিয়ে বা বসবাস করতে গিয়ে ধরা পড়া বিদেশি নাগরিকদের পুলিশ আটক করে এবং আদালতে বিচার হয় বিদেশি আইন অনুযায়ী।

আদালত রায় দিলে সেই সাজা খাটার জন্য কারাগারে রাখা হয়। মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিচয় ও ঠিকানা নিশ্চিত করা হয় এবং সবশেষে প্রত্যর্পণ করা হয়।

তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরে যেসব বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তাদের চিহ্নিতকরণ ও প্রত্যর্পণের জন্য স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গঠন করতে হবে প্রতি রাজ্যকে।

প্রতিটা জেলায় পুলিশের তত্ত্বাবধানের হোল্ডিং সেন্টার গড়তে হবে এবং রাজ্য সরকারগুলোকেই তাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে হবে। যে রাজ্যের বাসিন্দা বলে সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তি দাবি করবেন, সেই রাজ্যের পুলিশকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিচয় যাচাই করে রিপোর্ট পাঠাতে হবে।

যদি ৩০ দিনের মধ্যে সেই রিপোর্ট না আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা এফআরআরও সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

• হোল্ডিং সেন্টার কেন?

গত বছর থেকে শুরু হওয়া কথিত অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ অভিযানগুলো উত্তর আর পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেই চালানো হয়েছিল; যেখানে আটক হওয়া সন্দেহভাজনদের হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হতো প্রাথমিকভাবে।

কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গেও এ ধরনের হোল্ডিং সেন্টার গঠনের অর্থ কী যে, এই রাজ্যেও কথিত অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণ অভিযান শুরু হবে? মুখমন্ত্রী হওয়ার পরে শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যেও কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’ করা হবে।

মনে করা হচ্ছে সেই ঘোষণা অনুযায়ীই সপ্তাহের শেষের দিকে নির্দেশিকা জারি করল রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। নাগরিকত্বর অধিকার নিয়ে সরব অর্থনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট, বর্তমানে জাতীয় কংগ্রেসের নেতা প্রসেনজিৎ বসু বলছিলেন, এধরনের হোল্ডিং সেন্টার গড়ার দরকারটা কেন পড়ল? কতজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা আছেন পশ্চিমবঙ্গে? সেই তথ্য রাজ্য সরকার আগে দিক!

‘‘আমি গত বছর আগস্ট মাসে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ২০০০ সাল থেকে গত বছর আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে কতজন অবৈধ অনুপ্রবেশাকারীকে আটক করা বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার আরও প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ধর্মীয় পরিচয় কী কী; সেই ভাগাভাগিও জানানো হোক। বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী কতজন এখন পশ্চিমবঙ্গ আর অন্যান্য রাজ্যের কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টারে রয়েছেন; এই প্রশ্নও ছিল আমার।’’

তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা কতজন কথিত অনুপ্রবেশাকারীকে সেদেশে পুশ-ব্যাক করা হয়েছে এবং যারা ধরা পড়েননি;  এমন কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আনুমানিক সংখ্যা কত?

বসু বলছেন, এখনও কোনও প্রশ্নেরই উত্তর তিনি পাননি। একের পর এক দপ্তরের কাছে তার আবেদন পাঠানো হয়েছে মাত্র। তার কথায়, তথ্যগুলো জানা গেলে তারপরই এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বিবিসি বাংলা।


এই বিভাগের আরো খবর