শীতের মরসুমে মুক্তি পাচ্ছে স্বামী-স্ত্রী জুটির নতুন ছবি ‘সন্তান’। বিয়ের পর পরিবারকে কেন্দ্র করে জীবনটাই বদলে গিয়েছে রাজ চক্রবর্তী এবং শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের। নতুন ছবির পাশাপাশি, একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ থেকে শুরু করে পরিবার বিষয়ে অকপট দম্পতি।
প্রশ্ন: চলচ্চিত্র উৎসবে আপনি ছিলেন না। দার্জিলিঙে শুটিং করছিলেন। উৎসবকে কতটা মিস্ করলেন?
রাজ: উৎসবে যেতে পারব না বলে গৌতমদাকে (পরিচালক গৌতম ঘোষ) মেসেজ করেছিলাম। উপস্থিত থাকতে পারিনি বলে খারাপ লেগেছে। মিস্ করেছি। কিন্তু শুটিং পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
শুভশ্রী: সত্যি বলতে, এই ছবিটা নিয়ে আমি খুবই অন্য রকম প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। বাংলার বাইরে থেকে যেমন মেসেজ পেয়েছি, তেমনই আমাদের আবাসনে অবাঙালিরাও ছবিটার কথা জানেন। বুঝতে পারছি, গল্পের নির্যাস ইতিমধ্যেই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ভাল লাগছে। ইয়ালিনির জন্মদিনে ইসকনের সন্ন্যাসীরা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। প্রধান প্রভু অবাঙালি। তিনিও কিন্তু ‘সন্তান’-এর ট্রেলার দেখে ছবিটা দেখতে চেয়েছেন।
প্রশ্ন: রাজ, এই সংলাপ থেকেই জানতে চাই, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ককে কী ভাবে দেখেন?
প্রশ্ন: আপনার জীবনে এ রকম কোনও ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন?
রাজ: অনেক উদাহরণ দিতে পারি। যেমন, এক সময় আমার বাবা খুব ধূমপান করতেন। নিষেধ করা সত্ত্বেও লুকিয়ে লুকিয়ে ধূমপান করতেন। আমি সিগারেটের প্যাকেট দেখলেই লুকিয়ে রাখতাম। বাবা তাতে একটু রেগে যেতেন। মা কিন্তু তখন বাবার পক্ষে নিতেন। আমি বোঝালেও মা বলতেন, ‘‘প্রয়োজনে বাবাকে বোঝাও। কিন্তু তুমি বাবার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে পারো না।’’ এই হচ্ছে বাবা-মায়ের রসায়ন।
রাজ: মা তো আমাকে এ রকমও বলেছিলেন যে, প্রয়োজনে বাবাকে নিয়ে তিনি আমাদের হালিশহরের বাড়িতে চলে যেতে পারেন। কিন্তু বাবাকে কোনও ভাবেই অসম্মান করা যাবে না। কারণ, আমার মায়ের সহজ বক্তব্য, ‘‘এই মানুষটার জার্নি আমি জানি না।’’ এই ছবিটা পরিচালনা করতে গিয়ে ভীষণ ভাবে আমার পরিবারের বিভিন্ন ঘটনা মনে পড়েছে। আর মনে হয়েছে, আমি যেন এই সন্তানটা (ছবিতে ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনীত চরিত্র) কোনও দিন না হই!
প্রশ্ন: এই যে একটা সর্বজনীন বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা করেছেন, বাংলা ছবিতে কি ইদানীং সেটা একটু কমে গিয়েছে?
রাজ: সব ছবিতেই কিছু না কিছু বার্তা থাকে।

শুভশ্রী: একজন দর্শক হিসেবে ছবিকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই দেখি। তাই সেখানে যে কোনও সামাজিক বার্তা থাকতেই হবে, সেটা বিশ্বাস করি না। এটা নির্ভর করে পরিচালকের উপরে, যে তিনি কী ভাবে ছবিটা পৌঁছে দিতে চাইছেন।
রাজ: শুধুই বার্তা পাওয়ার জন্য তো আমি কোনও বই পড়ে নিতে পারি। সিনেমায়, বিনোদনের মোড়কে কোনও সামাজিক বার্তা থাকতেও পারে, আবার না-ও পারে।
রাজ: অবশ্যই। একটা ঘটনা বলি। আট-ন’মাস আগে ব্যারাকপুরে আমার বিধানসভা কেন্দ্রে একজন বয়স্ক মহিলাকে ঘুরতে দেখি। কোথায় বাড়ি, কিছুই বলতে পারছিলেন না। আমার টিমকে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সব খুঁজে বার করতে বলি। তার পর ভদ্রমহিলার বাড়ি আমরা খুঁজে পাই। চার-পাঁচ দিন পর তাঁর বাড়ি পাওয়া গেল। সেখানে গিয়ে বাড়িতে ছেলে জানান যে, মা এমনি হারিয়ে গিয়েছেন। তার পর তাঁকে আমরা ফুটেজ দেখাই যে, কী ভাবে তাঁরা মাকে গাড়ি থেকে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: মিঠুন বলেছেন, এ রকম একটা ছবি নাকি পরিচালনা করা কঠিন। তাঁকে পরিচালনা করা কতটা কঠিন?
রাজ: সাধারণত মিঠুনদাকে প্রস্তুতি নিতে হয় না। কিন্তু কিছু দৃশ্যের জন্য তাঁকেও দেখেছি ফ্লোরে আলাদা ভাবে প্রস্তুতি নিতে। আর মিঠুনদার জন্য আমি সব সময় প্রস্তুত থাকতাম। এক দিনও দেরি করাইনি। অসাধারণ অভিনয় করেছেন মিঠুনদা।
শুভশ্রী: দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হল। আমার শুটিং না থাকলেও মিঠুনদা কী ভাবে শট দিচ্ছেন, সেটা দেখতে আমি নিয়মিত ফ্লোরে যেতাম। এত বড় একজন অভিনেতা সারা ক্ষণ দাঁড়িয়ে অন্যকে ‘কিউ’ দিচ্ছেন! এটাও কিন্তু একটা শিক্ষণীয় বিষয়।
রাজ: ইরফান খান আমার অন্যতম প্রিয় অভিনেতা। কিন্তু তাঁর সঙ্গে তো আর কোনও দিন কাজ করতে পারব না। কিন্তু আমি ঋত্বিককে পেয়েছি। এই চরিত্রটা অনেকেই করতে রাজি হত না। কিন্তু ঋত্বিক সেই সাহস দেখিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি পর পর বেশ কয়েকটা ছবি করলেন। একে অপরের সঙ্গে কাজের সুবিধা-অসুবিধা কী কী?
রাজ: আমার শুটিং ফ্লোরে সকলেই পেশাদার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে আসেন। ফ্লোরে নিয়মানুবর্তিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে কাউকে নিয়ে আমার কোনও সমস্যা হয় না (হাসি)। অভিনেত্রী হিসেবে যে কোনও চরিত্রের জন্য বাড়িতে নিজের মতো করে প্রস্তুতি নেয় শুভ। তার জন্য আমি ওকে সম্মান করি। যতটা ভাবি, তার থেকেও ফ্লোরে গিয়ে আরও বেশি কিছু দিয়ে চলে যায় ও।
শুভশ্রী: ওরা তো তারকা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। এটা ওরা অস্বীকার করতে পারবে না। আমার মনে হয়, বড় হওয়ার সঙ্গে ওরাও বুঝতে পারবে, যে মানুষগুলোর জন্য নামের পাশে ‘তারকা’ জুড়ে গিয়েছে, তাঁরাও কিন্তু খুবই সাধারণ। কারণ আমরা সাধারণ ভাবেই জীবন যাপন করতে পছন্দ করি।

প্রশ্ন: বাবা-মা হিসেবে নিজেদের ১০ এর মধ্যে কত নম্বর দেবেন?
রাজ: নিজেকে ১০-এ ১০ দেব। আর মা হিসেবে শুভকে ১০-এ ১০০ দেব।
(রাজের উত্তর শুনে হেসে ফেললেন শুভশ্রী)
প্রশ্ন: রাজ কি ঠিক বলছেন?
প্রশ্ন: কেন?
প্রশ্ন: সন্তানদের কী ভাবে বড় করে তুলতে চান?
শুভশ্রী: দেখুন, আমরা আমাদের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা থেকে ওদের পথ দেখাব। কিন্তু আমরা কোনও দিন ওদের ‘বস্’ হতে চাই না।
শুভশ্রী: আমরা ওদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবেই মনে করি। স্বতন্ত্র হিসেবেই বিচার করি।
প্রশ্ন: শুভশ্রী, আপনি রাজের প্রজেক্ট প্রযোজনা করেছেন। কখনও রাজকে পরিচালনা করার কথা ভেবেছেন?
প্রশ্ন: টলিউডে এখন তারকা দম্পতিদের ‘বিচ্ছেদ’ চর্চায়! রাজ-শুভশ্রী জুটি এখনও শক্ত। নেপথ্যে কোন রহস্য?
রাজ: এটা তো তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আর আমাদের সম্পর্কের ‘রাজ়’টা রাজ থাকুক (হাসি)।
রাজ: (থামিয়ে দিয়ে) বিয়ে করলাম, ভালবাসলাম— সেখানেই সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। এফর্ট দিতে হয়। সম্পর্ক মানেই প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। নিজের ভাবনা কিছু না ভেবেই অন্যের উপর চাপিয়ে দিলে অন্যকে সম্মান না করলে তো দু’জন একসঙ্গে থাকতেই পারবে না। সম্পর্ক যদি প্রায়োরিটি হয়, তা হলে সেটাকে সবার ঊর্ধ্বে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজ: সম্পর্কে সমস্যা আসতেই পারে। কিন্তু সেটার সমাধান বার করতে হবে। আগে দেখতে হবে যে, আমি সত্যিই সমাধান চাইছি কি না।
প্রশ্ন: দাম্পত্য জীবনও তো মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।
শুভশ্রী: আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম।
শুভশ্রী: খারাপ তো আরজি কর-কাণ্ড।
রাজ: হ্যাঁ, অবশ্যই।
শুভশ্রী: বাড়িতে দুটো মিষ্টি বাচ্চা, এত আধুনিকমনস্ক একজন স্বামী যার রয়েছে, তার তো বছরের সব দিনগুলোই ভাল।
(শুভশ্রী হাসতে শুরু করলেন)
রাজ: প্রযোজকেরা সেটা আমার থেকে ভাল বোঝেন। এ বারে আমি শুধুই প্রযোজক, তাই চাপ অনেকটাই কম। বাংলায় এর আগেও একসঙ্গে একাধিক ছবি মুক্তি পেয়েছে। দর্শক ঠিক তাঁদের পছন্দ মতো ছবি খুঁজে নেবেন।