দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন হতাশার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে নিরুত্তাপভাবে শুরু হওয়া ভোট বেলা গড়াতেই বাড়ে উত্তেজনা। তিন হলে কিছু সময়ের জন্য ভোট বন্ধ থাকে। আঙুলে লাগানো অমোচনীয় কালি উঠে যাওয়া, কালি শেষ হওয়া, প্রার্থীদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া নিয়ে চলতে থাকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় ছাত্রদলের প্যানেল। এরপর বিএনপিপন্থি তিন শিক্ষকও নির্বাচনি কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন।
ছাত্রদলের বর্জনের পর আরও তিন ঘণ্টা ভোটগ্রহণ হয়েছে। সন্ধ্যার পর বর্জনের তালিকায় যুক্ত হয় বামপন্থি সংগঠনের চার প্যানেল। এই চারটি প্যানেল হলো- ‘সম্প্রীতির ঐক্য’, ‘সংশপ্তক পর্ষদ’, ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আংশিক প্যানেল। বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। অভিযোগের তীর প্রশাসন ও নির্বাচন আয়োজকদের বিরুদ্ধে। রয়েছে পক্ষপাতিত্বেরও অভিযোগ। আট প্যানেলের পাঁচটি ভোট বর্জন করায় এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পাঁচটি প্যানেলের প্রার্থীরা পুনর্নির্বাচনের দাবিও তুলেছেন।
দিনব্যাপী যা ঘটেছে
সকাল ৯টায় ভোট শুরুর কথা থাকলেও শুর করতে দেরি হয় আধাঘণ্টা। এরপর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল থেকে ছাত্রদলের এক নেতাকে আটক করা হয়। বেলা ১১টার দিকে তাজউদ্দীন আহমদ হলে ভোটার তালিকা ও কালি শেষ হয়ে যাওয়া নিয়ে হট্টগোল শুরু হয়। সেখানে ভোট বন্ধ থাকে ২৫ মিনিট।
এসব ঘটনার মধ্যে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে নানা অভিযোগ করতে থাকেন ছাত্রদল প্যানেলের প্রার্থীরা। শিবির প্যানেলের প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন ছাত্রদল প্যানেলের পরিবহন বিষয়ক সম্পাদক পদপ্রার্থী। এরপর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ভাসানী হলে সাংবাদিক ডেকে ভোট বর্জন করে ছাত্রদল।
বর্জনের কারণ
বর্জনের কারণ হিসেবে ছাত্রদল প্যানেলের জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী দাবি করেন, ভোট দেওয়ার সময় ১৫ নম্বর ছাত্রী হলে আঙুলে দেওয়া কালি মুছে যাচ্ছিল, একটা ব্যালট পেপার ফ্লোরে পাওয়া গেছে। এসব কারণে এই হলে দুই ঘণ্টা নির্বাচন বন্ধ ছিল। একটি হলে এই প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থীকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাজউদ্দীন আহমদ হলে ভোটার তালিকায় ছবি না থাকায় ভোট বন্ধ ছিল। জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে ছাপানো ব্যালটে ভোট হচ্ছে। সব হলে ছাত্রদলের প্যানেলের এজেন্টদের থাকতে দেওয়া হয়নি।
বৈশাখী আরও বলেন, প্রশাসন কেন শতকরা ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছেপেছে। আমাদের প্রশ্ন, জামায়াত নেতার কোম্পানি থেকে ছাপানো ব্যালটের শতকরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিবিরকে দেওয়া হয়েছে কিনা? আমাদের প্রার্থী ও এজেন্টদের বাধা দিয়ে ওই জাল ব্যালট দিয়ে ভোট কাস্ট করা হচ্ছে কিনা?
ভোট কেন্দ্রগুলো মনিটর করার জন্য জামায়াত নেতার কোম্পানিকেই সিসিটিভির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করে এই প্যানেল। ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের বিজয় ব্যাহত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে এক হয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থা করেছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এরপর তিন শিক্ষক নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। তারা হলেন- গণিতের বিভাগীয় প্রধান নজরুল ইসলাম, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা ও ভুগোল বিভাগের নাহরিন ইসলাম খান। তারা তিন জনই বিএনপিপন্থি শিক্ষক হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। তিন জনই নির্বাচন মনিটরিং সেলের সদস্য ছিলেন।
বামপন্থি সংগঠনের চার প্যানেলের সরে দাঁড়ানোর কারণ কী
সন্ধ্যা গড়াতে বামপন্থি সংগঠনের চার প্যানেল ‘সম্প্রীতির ঐক্য’, ‘সংশপ্তক পর্ষদ’, ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আংশিক প্যানেল ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়। বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন।
তাদের দাবি, ব্যালট বাক্স নিয়ে হট্টগোল, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ম্যানেজ করতে না পারা, পোলিং এজেন্টদের কাজ করতে না দেওয়া, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা ইত্যাদি অনেক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির কারণে এই নির্বাচনকে ঘিরে অনেক সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে সংশপ্তক প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী ইমন বলেন, আমরা নির্বাচন বয়কট করেছি বেশ কিছু কারণে। ব্যালটে কিছু অসংগতি, বহিরাগতদের আনাগোনা, ব্যালট পেপারে ছবি না থাকা, পক্ষপাতিত্বসহ বেশ কিছু ঘটনা আমরা দেখেছি। নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিগণ জানেনই না কীভাবে ভোট আয়োজন করতে হয়। জাহাঙ্গীরনগরের মতো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির জন্য মূলত প্রশাসনের অনভিজ্ঞতাকেই আমি দায়ী বলবো, কারণ দীর্ঘ দিন ধরে জাকসু নির্বাচন হয়নি।
বর্জনের পরও এই প্যানেলের কেউ জয়লাভ করলেও পদ গ্রহণ করবেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রশ্নই আসে না। বর্জন মানে বর্জন। জয়ী হলেও আমরা কোনও পদ নেবো না।
যা বলছে বাগছাস
পাঁচ প্যানেলের ভোট বর্জন নিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) প্যানেল মনোনীত ভিপি প্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘কিছু অসংগতি হয়েছে। কিন্তু কোনও কারচুপির অভিযোগ আমরা করছি না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনও পক্ষপাতিত্ব আমরা দেখতে পাইনি। যদিও ছাত্রদল নির্বাচনের শেষের দিকে বর্জন করেছে। কিন্তু অন্য সংগঠনগুলো বর্জন করেছে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর। যা কোনও সাংগঠনিক কার্যক্রম হতে পারে না। তারপরও এটা তাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, এখানে আমাদের কোনও মতামত নেই।’
ভোট বর্জনের বিষয়ে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ সাদীকে কল দিলে তিনি এ বিষয়ে যা বলার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন বলে লাইন কেটে দেন। এই প্যানেলের তানজিলা হোসেন বৈশাখীর নম্বরে কল দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বললেন নির্বাচন কমিশনের সদস্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লুৎফর এলাহী বলেন, ‘আমি এখনও হলে অবস্থান করছি, কারা বর্জন করেছে এ বিষয়ে এখনও কিছু জানি না।’ তাকে নির্বাচন বর্জনকারী প্যানেলগুলোর নাম বললে তিনি বলেন, ‘এটা ওই প্যানেলগুলোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে, আমরা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছি।’
প্রসঙ্গত, এবারের জাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ হাজার ৯১৯। নির্বাচনে ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১৭৭ প্রার্থী। নির্বাচনে বামপন্থি, শিবির, ছাত্রদল ও স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের সমর্থিত ৮টি প্যানেল অংশগ্রহণ করে। তবে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছে ছাত্রদলসহ বামপন্থি সমর্থিত পাঁচটি প্যানেল।
এদিকে নির্বাচন শেষে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট হলে রাত সোয়া ১০টার দিকে ভোট গণনা শুরু হয়। এর আগে সকাল ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকাল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। তবে তখনও ভোটের সারিতে থাকা শিক্ষার্থীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। ভোটগ্রহণ শেষে ২১টি হল থেকে ব্যালট বাক্সগুলো সিনেট হলে নেওয়া হয়। এরপর ভোটগণনা শুরু হয় রাত সোয়া ১০টায়। গণনা শেষ করতে এবং ফল ঘোষণা হতে শুক্রবার সকাল হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক একেএম রাশিদুল আলম।